Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

উল্টো স্রোতে ইলিশের বাণিজ্য

এখন সময়: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর , ২০২৬, ১০:৪২:৪৭ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে কলকাতায় পদ্মার ইলিশ যাবে কিনা—তা নিয়ে মুখিয়ে থাকেন পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু এবার দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের বাজারে ইলিশের সংকট মেটাতে ভারত থেকেই ইলিশ আসছে দেশে। আর এই আমদানিকৃত ইলিশই দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে ‘বরিশালের ইলিশ’ নামে। সাধারণ ক্রেতারা চড়া দামে তা কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতির মাঝেই আবার ওপার বাংলার ব্যবসায়ীরা শুরু করেছেন বাংলাদেশ থেকে ইলিশ নেওয়ার তোড়জোড়। ইলিশ নিয়ে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দ্বিমুখী ইলিশ বাণিজ্য প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। বেনাপোল বন্দরের মৎস পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ১৯টি আমদানিকারকের মাধ্যমে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে আগস্টেই এসেছে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি। জুলাইয়ে এসেছিল ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি। আমদানি করা এসব ইলিশের ঘোষিত মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ফেমাস ট্রেডার্স, সততা ফিশ ফিড, শরীফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, স্বর্ণালী ইন্টারন্যাশনাল ও রাব্বি এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন আমদানিকারক এসব মাছ এনেছেন। আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হতো পদ্মার ইলিশ। এখন সেই ভারতের ইলিশের বড় একটি অংশ আসছে বাংলাদেশে। ভারতীয় ইলিশের পাশাপাশি মিয়ানমারের ইলিশও ঢুকছে দেশের বাজারে। তবে ঠিক কী কারণে বা কোন উৎস থেকে এই মাছ আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে খোদ মৎস্য বিভাগের ভেতরেই। যশোরের ঐতিহ্যবাহী বড়বাজারে দোকান কিংবা আড়তে ভরে গেছে ভারতীয় ইলিশ। আমদানি করা ইলিশ কাটুন থেকে নামাচ্ছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। বাজারে ইলিশের দামের ঝাঁজ ভালোই চড়া। বাজারে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায়। আর ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা কেজি দরে। বরফের ওপর সাজানো রয়েছে নানা আকারের ইলিশ। ক্রেতারা মাছ হাতে নিয়ে দেখছেন, পেট পরীক্ষা করছেন, ওজন ও দাম জেনে দরদাম করছেন। কিন্তু মাছের উৎস জানতে চাইলে কয়েকটি দোকানে বিক্রেতাদের মুখে শোনা যাচ্ছে—‘বরিশালের ইলিশ’। বাজারে কথা হয় কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে। তাদের অভিযোগ, বাজারে এখন যেসব ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, তার আকার, স্বাদ ও গন্ধ তুলনামূলকভাবে কম। এসব ইলিশ আসছে ভারত থেকে। তবে এগুলো ‘বরিশালের ইলিশ’ বলে বাজারে বিক্রি করছে বিক্রেতারা। আব্দুল কাদের নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘দেশি ইলিশ মনে করেই একটি মাছ কিনেছি। পরে খাওয়ার পর বুঝতে পারি মাছটির স্বাদ ও গন্ধ দেশি ইলিশের মতো নয়। দেখতে প্রায় একই হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে বিদেশি ও দেশি ইলিশের পার্থক্য বোঝা কঠিন। যশোরের বাজারে ভারতীয় ইলিশে সয়লাব। দোকানদাররা কোনটা ভারতীয় কোনটা দেশীয়; সেটা বলছে না। এতে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন।’ আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, ২৫২ টাকায় আমদানির পর এক কেজি ইলিশের দাম শুল্ক ও পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ৫১৪ টাকা পড়ে। আমদানি কারকদের কাছ থেকে সেই মাছ যশোরে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে। বিপরীতে একই আকারের দেশি ইলিশের দাম প্রায় ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা কেজি। ফলে কম দামের কারণে ক্রেতাদের বড় একটি অংশ বিদেশি ইলিশের দিকে ঝুঁকছেন। পাইকার ব্যবসায়ী ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ অবশ্য স্বীকার করছেন আমদানিকৃত মাছের ভিন্নতার কথা। ভারত থেকে আসা ইলিশগুলোর চেহারা ও বৈশিষ্ট্যে তফাত আছে। দেশের বাজারে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় ও মিয়ানমারের ইলিশ আসায় দেশি ইলিশের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। আলমগীর হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘দেশের বাজারে গুজরাট, মুম্বাই ও মিয়ানমারের ইলিশ ঢুকছে। এসব ইলিশ প্রতি পিচ কেজির উপরে। পেটে ডিমে ভরা। স্বাদ নেই।’ তবে স্থানীয় বাজারে ভারত থেকে আসা ইলিশ ‘বরিশালের ইলিশ’ নামে বিক্রির অভিযোগ উঠলেও বড়বাজারের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর শেখ তা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ভারত আর বাংলাদেশে যা ইলিশ বিক্রি হয়; সব একই সাগরের মাছ। স্বাদ গন্ধে একই। কোন পার্থক্য নেই।’

# গুজরাটের ইলিশের আকর্ষণ ডিমে গুজরাটের ভারুচ থেকে আসা ইলিশের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক হিসাব কিছুটা ভিন্ন। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, গুজরাটের ইলিশে ডিমের পরিমাণ বেশি। ভারতের বাজারে এই মাছের চাহিদা তুলনামূলক কম হলেও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাজারে ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা রয়েছে। ইলিশের ডিম আলাদা করে প্রক্রিয়াজাত ও পুনরায় রপ্তানি করা হচ্ছে বলে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দাবি। গুজরাটের ভারুচের ভাদভূত এলাকায় নর্মদা নদী সাগরে মিশেছে। ওই মোহনা এলাকায় গুজরাটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ে। স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি বাংলাদেশেও রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে ইলিশ পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে গুজরাটে ইলিশের দাম প্রতি কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ ভারতীয় রুপি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম ৩০০ থেকে ৪০০ রুপিতে নেমে আসে। বাংলাদেশের আমদানিকারকদের কাছে পরিবহন খরচসহ গড়ে ৫০০ টাকায় কেনার কথা জানিয়েছেন যশোরের ব্যবসায়ীরা।

# ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দ্বিমুখী ইলিশ বাণিজ্য ভারতীয় ব্যবসায়ীরা তাদের ইলিশ যখন বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন, তারাই এখন বাংলাদেশ থেকে পদ্মা-মেঘনার ইলিশ নেওয়ার অনুমতি চাইছেন। বাংলাদেশ থেকে ইলিশ নেওয়ার জন্য আবার আবেদন করেছে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। গত ৯ সেপ্টেম্বর সংগঠনটি আলাদা চিঠি দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। একই সময়ে বাংলাদেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠান ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়েছে। ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই সংগঠনটির পক্ষ থেকে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ওই চিঠিতে ২০২৪ সালে অনুমোদিত দুই হাজার ৪২০ টনের বিপরীতে মাত্র ৫৭৭ টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি হয়েছে। ইলিশ নিয়ে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দ্বিমুখী ইলিশ বাণিজ্য প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল নেতৃবৃন্দ। ইলিশ ব্যবসায়ী এরশাদ আলী জানান, ‘গুজরাটের ব্যবসায়ীরা কম দামে বেশি ডিমওয়ালা ইলিশ বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সেই মাছের ডিম আলাদা করে প্রক্রিয়াজাতের পর রপ্তানি করছেন। মাছের বাকি অংশও লবণ দিয়ে সংরক্ষণ বা অন্যভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছেন। অন্যদিকে একই ভারতীয় ব্যবসায়ী সংগঠন বাংলাদেশের কাছে পদ্মা-মেঘনার ইলিশ চাইছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা আলাদা। কেননা স্বাদ, গন্ধে বিখ্যাত বাংলাদেশের ইলিশ। তাও আবার সামনে দুর্গাপূজা। পূজার উৎসবে ওপারবাংলায় কেউ মাংস না খেলেও ইলিশ ঠিকই খাবে।’ তবে বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের ইলিশ আমদানিকে সর্তকবার্তা হিসাবে দেখছেন টিআইবির যশোরের সভাপতি পাভেল চৌধুরি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের নদীগুলোতে দূষণ ও নাব্য সংকট দীর্ঘদিনের। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় ইলিশের আবাস ও চলাচলের ওপর চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে গিয়ে যদি বাজারের চাহিদা পূরণে প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে এটি ইলিশের জন্য বড় হুমকি।’

Ad for sale 100 x 870 Position (2)
Position (2)
Ad for sale 225 x 270 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 225 x 270 Position (4)
Position (4)