নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর শহরের শংকরপুরে ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে গুলি করে হত্যার নেপথ্যে ‘দুই কারণ’ সামনে রেখে তদন্ত এগিয়ে চলেছে। একটি কারণ, জামাই পরশের সাথে শ্বশুর আলমগীরের দ্বন্দ্ব ও এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব। হত্যকাণ্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায়ও এই দু’টি বিষয় সামনে এসেছে। পুলিশ ইতোমধ্যে জামাই পরশ ও সাগর নামে দুজনকে আটক করেছে। আলমগীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম।
আটক দুজন হলেন-নিহত আলমগীরের জামাতা শংকরপুর ইসহাক সড়ক এলাকার জুলফিকার আলীর ছেলে বাসেদ আলী পরশ (২৯) ও মৃত মতিন দারোগার ছেলে আসাবুল ইসলাম সাগর (৫২)।
শনিবার সন্ধ্যায় যশোর শহরের শংকরপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং শংকরপুর ইসহাক সড়ক এলাকার মৃত ইন্তাজ আলী চৌধুরীর ছেলে আলমগীর হোসেন (৫৫)।
এদিকে আলমগীর হোসেন হত্যা মামলায় আটক বাসেদ আলী পরশ ও আসাবুল ইসলাম সাগরকে ৪ জানুয়ারি বিকেলে আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ। আদালত পরে দুইজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। আর এই মামলাটি তদন্ত করছেন ডিবি পুলিশের এসআই অলোক কুমার দে। তিনি জানিয়েছেন, নিয়মানুযায়ী দুইজনের বিরুদ্ধে ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। আদালত মঞ্জুর করলে তাদের এ বিষয়ে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
রোববার দুপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, শনিবার বিএনপি নেতা আলমগীর হত্যাকাণ্ডের পর যশোর ডিবি ও থানা পুলিশের ৫টি দল অভিযান শুরু করে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার ও ভিকটিমের স্বজনদের বক্তব্য এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্তে অভিযান শুরু করে।
রোববার সকালে নিহত আলমগীরের স্ত্রী বাদী হয়ে জামাই বাসেদ আলী পরশ ও একই এলাকার আসাবুল ইসলাম সাগরের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রেক্ষিতে এজাহারভুক্ত পরশ ও সাগরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার আরও জানান, প্রায় দশ বছর আগে পরশের সাথে আলমগীরের মেয়ের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে পারিবারিক বিরোধ ছিল। বিভিন্ন সময়ে যৌতুকের জন্য চাপ দিত পরশ। এছাড়া আলমগীরের জমি ও গাড়ির প্রতি লোভ ছিল তার। পারিবারিক বিরোধের কারণে একবার পরশের সাথে ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। পরে সামাজিকভাবে মীমাংসা হলেও বিরোধ মেটেনি। সম্প্রতি দুই সন্তান নিয়ে আলমগীরের মেয়ে তার বাড়িতেই থাকতো। এই বিরোধে পরশ শ্বশুর আলমগীরকে দেখে নেয়ারও হুমকি দিয়েছিল।
এছাড়া, এলাকাগত বিরোধের কারণে আসাবুল ইসলাম সাগরকে মামলার আসামি করা হয়েছে। ৫ আগস্টে পট-পরিবর্তনের পর সাগরসহ তার লোকজন আলমগীরের ভাই আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীরের বাড়ি ভাঙচুর করতে যায়। কিন্তু এ সময় আলমগীর বাধা দেন। এ নিয়ে তার সাথে বিরোধের সূত্রপাত হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আলমগীরের বিরুদ্ধে এই সাগর ফেসবুকে নানা স্ট্যাটাস দিয়েছে। কয়েক মাস আগে সাগরের স্ত্রী বাদী হয়ে আলমগীর এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করেছে। এই কারণকেও বিবেচনায় এনে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তারা কেউ সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি। ভাড়াটে খুনি দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম উল্লেখ করেন, এজাহারে এই দু’টি কারণকে সামনে আনা হয়েছে। তবে পুলিশ পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখছে। দ্রুতই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের সামনের নিয়ে আসা হবে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যায় আলমগীর হোসেন মেডিকেল কলেজ এলাকা থেকে মোটরসাইকেলে চড়ে শংকরপুরে বাড়িতে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে মোটরসাইকলে থেকেই অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। একটি গুলি তার মাথার বাম পাশে বিদ্ধ হয় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে যশোর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা জানান, সরাসরি মাথায় গুলি কারণে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
অপরদিকে-নিহত আলমগীর হোসনের ময়নাতদন্ত শেষে বাদ আসর শংকপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে কারাবালা কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
জানাজায় অংশনেন বিএনপি’র খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জেলা বিএনপি’র সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবারুল হক সাবু, সাংগঠনিক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার রবিউল ইসলাম, নগর বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম চৌধুরী মুল্লুক চাঁদ, সাধারণ সম্পাদক এহসানুল হক সেতু, বিএনপি নেতা মুনীর আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু, হাজী আনিছুর রহমান মুকুল, জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা প্রমুখ।