স্পন্দন ডেস্ক : নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতিতে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী; যাতে মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীদের রাখা এবং রাজনৈতিক দলকে সরকারের তরফে বার্ষিক বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে এ ইশতেহার তুলে ধরেন দলের আমির শফিকুর রহমান। ৪১ দফার এ ইশতেহারে ক্ষমতায় গেলে দেশ পরিচালনায় তাদের পরিকল্পনার কথা সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে। ভোটে ১১ দলীয় জোট হয়ে অংশ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। ইশতেহারে ১০টি বিষয়ে দলটি কী করবে আর কী করবে সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে সরকার পরিচালনায় ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরে ‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের’ ইশতেহার ঘোষণা করেন জামায়াতের আমির। ইশতেহার ঘোষণার আগে ও পরে আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনায় দলটির অঙ্গীকার তুলে ধরে দুটি ভিডিও উপস্থাপনা দেওয়া হয়। এতে নির্বাচনে জয়ী হলে দলটির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষণা করা দীর্ঘ ইশতেহারকে আটটি অধ্যায়ে ভাগ করে ৪১টি দফায় উপস্থাপন করে জামায়াত। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দলটি কী কী করবে প্রতিটি দফায় অন্তত ৬ থেকে ১০টি পয়েন্টে সেগুলো তুলে ধরেছে। আর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ২৬টি বিষয়ে। নির্বাচনি প্রচারের মধ্যে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ‘নারী বিদ্বেষী’ পোস্ট সামনে আসা এবং নারীদের দলের প্রধান করার সুযোগ নেই বলে দলের প্রধানের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মধ্যে ইশতেহারে বেশি সংখ্যক নারীকে মন্ত্রিসভায় রাখার কথা বলেছে দলটি। ইশতেহারের শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার শীর্ষক অংশে বলা হয় “নারীদের মধ্য থেকে মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিনিধি অন্তর্ভূক্ত করা হবে”। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি জামায়াত।নারী, শিশু ও পরিবারের উন্নয়নের জন্য প্রতিশ্রুতিতে দলটি বলেছে, পরিবার কাউন্সেলিং ও মোটিভেশন সেন্টার চালু করা, নিরাপদ বিদ্যালয় কর্মসূচি ও মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য অনুদান ও সেবার পরিসর বাড়ানো। ‘রাজনৈতিক আমূল পরিবর্তনের’ প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অংশ হিসেবে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে (আসন ও ভোটের সংখ্যানুপাতে) রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বার্ষিক বরাদ্দ দেওয়া হবে। নির্বাচনে জিতলে কার্যকর জাতীয় সংসদ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছে জামায়াত। দলটি বলছে, তাদের ভিশন হবে সংসদকে দেশ গঠন, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং জবাবদিহির কেন্দ্রে পরিণত করা। এক্ষেত্রে জামায়াতের প্রতিশ্রুতি, “সংসদ সদস্যরা যাতে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে”। দেশ ও সমাজগঠনে শতাধিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে আরও রয়েছে- “নির্বাচনে সরকার গঠনে সক্ষম হলে দলটি প্রথম ১০০ দিনে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত সংস্কার করবে। প্রশাসনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট, এনআইডি ও অন্যান্য নাগরিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে“। জামায়াতের ইশতেহারে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বলা হয়, “সকল স্তরের উন্নয়ন পরিচালিত হবে স্থানীয় সরকারের অধীনে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কাজ হবে তদারকি ও সমন্বয় করা।” দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ শীর্ষক প্রতিশ্রুতিতে দলটি “দুর্নীতিবাজদের অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হবে”। পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রতিশ্রুতিতে জামায়াতের এক নম্বর অগ্রাধিকার- বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা বাড়ানো। পাশাপাশি ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা। ইশতেহার ঘোষণার সমাপনী বক্তব্যে জামায়াতের আমির শফিকুর বলেন, “আমরা সকল সভ্য দেশের সঙ্গে মানবিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই। আমাকে অনেক বিদেশিরা জিজ্ঞেস করেন, আমরা সক্ষমতায় আসলে কেমন সম্পর্ক হবে বিদেশিদের সঙ্গে। আমি উপরের চাঁদ দেখিয়ে বলেছি, কালারফুল রিলেশন হবে।“আমরা সবাইকে সম্মান দিতে চাই, আমরাও সবার কাছে সম্মান চাই। যদি পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিবেশি দেশের হাত ধরে চলি তাহলে পারস্পারিক হানাহানি, দূরত্ব দূর হবে।’ ইশতেহার ঘোষণার আগে ও পরে আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনায় দলটির অঙ্গীকার তুলে ধরে দুটি ভিডিও উপস্থাপনা দেওয়া হয়। এতে নির্বাচনে জয়ী হলে দলটির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়। জামায়াতের ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে অতিথিরা। জামায়াতের ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে অতিথিরা। ইশতেহারে বলা হয়, সরকারি চাকরির আবেদনের জন্য ফি নেওয়ার রীতি বাতিল করা হবে। কওমি মাদ্রাসার জন্য ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি বলছে, ‘কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস পরিমার্জন ও সার্টিফিকেটের মূল্যায়ন করবে’ জামায়াত। অষ্টম শ্রেণির পর মাধ্যমিকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে চারটি পৃথক ধারায় বিভক্ত করা হবে (ইসলামিক শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষা)। ইশতেহারের অষ্টম ভাগে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লব পর্বে প্রতিশ্রুতিতে জামায়াত বলেছে, “মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য (সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার) রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে। দলটি বলছে, “শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা হবে।”ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে অতিথিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, কসোভো, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, ব্রুনাই, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, ইরান, কানাডা, আলজেরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, ভুটান, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, ব্রাজিল, ভ্যাটিকান, জাতিসংঘ, ইউএনডিপি, আইআরআই, এনডিআই, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, এমএলও সহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কুটনীতিক ও কর্মর্কতারা উপস্থিত ছিলেন। ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের নেতাদের মধ্যে এনসিপির মুখপাত্র ও নির্বাচনি পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের, লেবার পার্টি (একাংশ) মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। জামায়াতের নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিমসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তবে নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের উপস্থিত ছিলেন না। ইশতেহার প্রণয়নে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পেশার ২৫০-এর বেশি বিশেষজ্ঞের সমন্বয় তৈরি করা জনগণের মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে বলা হয়। ‘জনতার ইশতেহার’ নামে একটি ওয়েবসাইটে সাধারণ মানুষের মতামত চাওয়া হলে বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ৪০ হাজার মতামত দেন ও তাদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন। ওয়েবসাইটে দেওয়া মানুষের প্রত্যাশা ও মতামতকে ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে। ইশতেহার ঘোষণার সময় তার এক্স অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ‘নারী বিদ্বেষী’ একটি পোস্টকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনার দিকে ইঙ্গিত করে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, “আমি আহত পাখির মতো এখন। আমার উপর যেভাবে কয়েকদিন মিসাইল চলছে। আমি অ্যান্টি মিসাইল ব্যবহার করি নাই। যারা এটা করেছে আমি তাদের মাফ করে দিয়েছি। আমি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।“ সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার রক্ত ও মেজাজের সঙ্গে প্রতিশোধ যায় না। ভুলের জন্য আমি যদি ক্ষমা করতে না পারি, ক্ষমা চাইতে না পারি তাহলে আমার ভুলের জন্য ক্ষমা চাইব কীভাবে? “আমি প্রতিশোধের পথে হাঁটতে চাই না। তাহলে আমার উপর আরেকজনের প্রতিশোধ নেওয়া প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।” নির্বাচনের আগে ঘরে বাইরে কোথাও শান্তি নাই মন্তব্য করে তিনি বলেন, চারিদিকে হাহাকার চলছে। আগের সরকারের সময়কার লুটপাট ও অর্থপাচারের সমালোচনা করে তিনি দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার করেন। তার দল সরকার পরিচালনার সুযোগ পেলে সবার জন্য ন্যয় ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তুলে ধরেন। জামায়াত ক্ষমতায় এলে কী কী পরিবর্তন ঘটবে তা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্যে তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “আমি আগেই বলেছি নির্বাচনে আমি জামায়াতের বিজয় চাই না, আমি চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়।” শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের দলের ইশতেহার তৈরিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মত দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকরা সহযোগিতা করেছেন।” আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের ইশতেহারকে জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, শান্তিবান্ধব, শৃঙ্খলাবান্ধব বলে দাবি করেন তিনি। প্রবাসীদের মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনার ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেন জামায়াতের আমির। বলেন, “বেকার ভাতা নয়, বরং আমরা তোমাদের হাতে কাজ তুলে দেব।” তিনি বলেন, “আমাদের এখানে চা বাগান থেকে উঠে আসা তরুণও প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, আমরা এমনভাবে গড়তে চাই।” নারীদের কর্মঘণ্টা ও অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি। ইশতেহারকে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে নয় জাতির প্রতি জীবন্ত দলিল হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি জনগণের কাছে জীবন্ত দলিল হিসেবে থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলো সমাজের প্রতি দায়বব্ধতা ও অঙ্গীকার থেকেই ইশতেহার দিয়ে থাকে।’