Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের আধিপত্যে ভাটা, কোন পথে মমতা?

এখন সময়: মঙ্গলবার, ৫ মে , ২০২৬, ০৪:৪৪:২৪ এম

নিউজ ডেস্ক: ৭১ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে ভারতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত তুখোড় রাজনীতিবিদ সম্ভবত তার ক্যারিয়ারের কঠিনতম লড়াইয়ের মুখোমুখি। বিশ্লেষকরা বলছেন, তৃণমূল কংগ্রেস শুরু হয়েছিল একটি আদর্শগত আন্দোলনের মাধ্যমে, কিন্তু পরে এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী ও ব্যক্তিত্ব-কেন্দ্রিক ‘রাজনৈতিক ক্লাব' হিসেবে কাজ করেছে। মমতার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা, জনকল্যাণমুখী রাজনীতি এবং রাজপথের লড়াকু মেজাজকে কেন্দ্র করে দলটি গড়ে উঠেছে। মমতার নেতৃত্বেই এতদিন রাজনীতিতে দলটি একচেটিয়া আধিপত্য রেখেছে। কিন্তু এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) উল্লেখযোগ্য জয় পাওয়ায় ভাটা পড়েছে তৃণমূলের সেই আধিপত্যে। মমতার সামনে এখন কি সেটিই বড় প্রশ্ন। তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি সবসময়ই পরাজিত শাসকদলের প্রতি নির্দয়। এখানকার ইতিহাস বলে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারাও দ্রুত পক্ষ পরিবর্তন করেন। এখন বড় প্রশ্ন হল, মমতা কি পারবেন দলের ভাঙন রুখতে এবং তৃণমূলকে একটি সংহতিপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখতে? গত অর্ধশতাব্দীতে পশ্চিমবঙ্গ মূলত দুটি শক্তিশালী শক্তির শাসন দেখেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি পারবেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে আবার ঘুরে দাঁড়াতে, নাকি বাংলার রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাবে তার দাপট, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ‘দিদি’র পতনে ১৫ বছরের দূর্গে ভাঙন: একটা সময় ছিল যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল পশ্চিমবঙ্গ শাসন করতেন না, বরং তিনি ছিলেন এই রাজ্যের রাজনৈতিক কল্পনার এক মূর্ত প্রতীক। ২০২১ সালে কলকাতার ভবানীপুরে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নজিরবিহীন প্রচারের পরও তৃণমূল কংগ্রেস যখন অভাবনীয় এক জনমত নিয়ে ক্ষমতায় ফিরল, তখন চারদিকে ছিল উৎসবের আমেজ। সবুজ পতাকায় ছেয়ে গিয়েছিল রাস্তাঘাট, লাউডস্পিকারে বাজছিল জয়ের গান। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে নারীরা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন আর কর্মীরা মেতেছিলেন উল্লাসে। তখন সাধারণ মানুষের মুখে একটিই কথা ছিল, “ভবানীপুরে দিদিকে হারানোর কেউ নেই।” সেই ভবানীপুরে অবশ্য আজও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনে স্বস্তিদায়ক অগ্রগতি ধরে রেখেছেন। কিন্তু সেই চৌহদ্দির বাইরে তাকালে দেখা যাচ্ছে অন্য এক দৃশ্য। ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি নিরঙ্কুশ জয়ের পথে, আর তৃণমূল অনেকটা পিছিয়ে ধুঁকছে। মমতার ১৫ বছরের দুর্গ পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের ভাঙন ধরেছে। বাংলার যে নাড়ির স্পন্দন একদা মমতা একাই বুঝতেন বলে দাবি করতেন, সেই রাজ্যে এই নির্বাচনী ফল কেবল রাজনৈতিক হার নয়, বরং তার অস্তিত্বের এক গভীর সংকট। এটি কেবল একটি সরকারের পতন নয়, বরং একটা সময়ে অপরাজেয় হিসাবে বিবেচিত হওয়া এক পূজনীয় রাজনৈতিক ‘ব্যক্তিত্বের’ ক্ষয়ে যাওয়ার গল্প। ‘দিদি’ হয়ে ওঠা: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সত্তা কোনো অভিজাত ড্রয়িং রুমের আলোচনা কিংবা টেলিভিশন স্টুডিওর সুশৃঙ্খল বিতর্কে গড়ে ওঠেনি। তার রাজনীতির ধাত্রীভূমি ছিল তপ্ত রাজপথ। বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের ইতিহাস লেখা হয়েছে রেললাইনের অবরোধে, অনশন মঞ্চের জেদে আর উত্তাল মিছিলের ভিড়ে। সহিংসতা বা অস্থিরতায় যখন অন্য নেতারা গ্রামে ঢুকতে দ্বিধাবোধ করতেন, মমতা তখন অবলীলায় পৌঁছে যেতেন একদম সংকটের মূলে। সাধারণ মানুষের বিপদে ছায়ার মতো পাশে দাঁড়ানোর এই অদম্য স্পৃহাই তাকে অনন্য করে তুলেছিল। চরম সমালোচকরাও মানতে বাধ্য হতেন, মমতা মানেই এক প্রাণবন্ত এবং লড়াকু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ক্ষমতার ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া ছন্দ: ব্যক্তিত্বের এই জাদু ততক্ষণই কাজ করে যতক্ষণ তা সাধারণ মানুষের আবেগের প্রতিফলন ঘটায়। কিন্তু সময় ও ক্ষমতা রাজনীতির ছন্দ বদলে দেয়। একদা যে তৃণমূল নিজেকে একটি ‘আন্দোলন’ হিসেবে দাবি করত, ধীরে ধীরে তা-ও প্রতিষ্ঠানের রূপ নিতে শুরু করে। তৃণমূল স্তরের কর্মীদের চেয়ে এলাকায় প্রভাবশালী নেতাদের দাপট বেড়ে যায়। দুর্নীতির অভিযোগ জমতে থাকে এবং সংগঠনের ভেতরে দানা বাঁধে ঔদ্ধত্য। সবচেয়ে বড় আঘাত আসে স্কুল শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে। শিক্ষা ও মেধার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বাঙালির মধ্যবিত্ত আবেগে এই দুর্নীতি গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। যোগ্য প্রার্থী বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে নিয়োগের এই অভিযোগ তৃণমূলের ভাবমূর্তিকে ম্লান করে দেয়। সেই সঙ্গে নারীদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় সরকারের রক্ষণাত্মক ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সাধারণ মানুষের চোখে পুরোনো সেই ‘দিদি’ আর ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো নেতা রইলেন না, বরং তিনি হয়ে উঠলেন রাজনৈতিক বেষ্টনীতে ঘেরা এক প্রশাসক। বিরোধী মেরুকরণ ও শুভেন্দুর উত্থান: ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কৌশলেই মমতার বিরুদ্ধে মানুষের এই ক্লান্তি ও অসন্তোষকে পুঁজি করেছে। তৃণমূলবিরোধী যে ক্ষোভ আগে ছিল ছড়ানো-ছিটানো, বিজেপি তা এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। আর এই রাজনৈতিক মেরুকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। একসময় যাকে মমতার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি মনে করা হতো, সেই শুভেন্দুই এখন তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহী। নন্দীগ্রাম, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক মিথ বা আস্থার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, সেই জনপদই এখন তার দুর্গ ভাঙার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর এগিয়ে থাকা মমতার রাজনৈতিক গ্ল্যামারের পতনের সংকেত দিচ্ছে। শীর্ষ নেতৃত্বের একাকিত্ব: দীর্ঘকাল রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা জননেতাদের ঘিরে প্রায়ই এক ধরণের অদ্ভুত একাকিত্ব দানা বাঁধে। সময়ের পরিক্রমায় এক সময় দল বা আন্দোলন ছাপিয়ে নেতার ব্যক্তি-পরিচয়ই মূখ্য হয়ে ওঠে। তখন শাসনের সমালোচনা আর নেতার ব্যক্তিগত সত্তার সমালোচনা, এই দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও সম্ভবত সেই একই গভীর সত্যটি এখন ফুটে উঠছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য বা ভালোবাসা হয়ত আজও অমলিন। ভারতের রাজনীতিতে তিনি এখনও অন্যতম পরিচিত ও দূরদর্শী এক মুখ। আজও জনসভায় মানুষের ঢল নামানোর যে সহজাত ক্ষমতা তার রয়েছে, তা খুব কম আঞ্চলিক নেতারই আছে। কিন্তু বর্তমান নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি বলছে - শুধুমাত্র ব্যক্তিক্যারিশমা দিয়ে সেই বিশাল আবেগীয় জোটকে আর ধরে রাখা যাচ্ছে না, যা একসময় তাকে ক্ষমতার চূড়ায় বসিয়েছিল। যে ‘বাংলার বাঘিনী’ একসময় অপরাজেয় মনে হত, আজ তিনি সম্ভবত এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি। যে বাংলাকে তিনি রাজনৈতিকভাবে আমূল বদলে দিয়েছিলেন, সেই রাজ্যটিই হয়ত এখন তার যুগ পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির সম্ভবত এটাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতা, যে ভোটাররা একজন নেতাকে হিমালয়সম উচ্চতায় আসীন করে, সময় ফুরিয়ে এলে তারাই আবার নিঃশব্দে সেই মিথ বা মহাকাব্যের ইতি টেনে দেয়।

Ad for sale 100 x 870 Position (2)
Position (2)
Ad for sale 225 x 270 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 225 x 270 Position (4)
Position (4)