রাকিব হোসেন, নর্থ মেসিডোনিয়া থেকে : পৃথিবী বিখ্যাত নোবেলজয়ী মানবতার প্রতীক মাদার তেরেসা ১৯১০ সালের ২৬ আগস্টে স্কোপিয়ে, অটোমান সাম্রাজ্য (বর্তমান উত্তর মেসিডোনিয়ায়) জন্মগ্রহন করেন। মানবসেবার অনন্য নজির স্থাপন করে নিজেকে নিয়েছেন অসীম উচ্চতায়। বিশ্বব্যাপী দরিদ্র, অনাথ ও মুমূর্ষ মানুষের নিঃস্বার্থ সেবা করে নিজেকে চিনিছেন ভিন্নভাবে। সেবাই ছিলই তার পরম ধর্ম। মানবসেবায় পৃথিবী বিখ্যাত এই মানুষটা উপরের ছবির এই বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।ছোট ছোট পাথরে দিয়ে তৈরি এ বাড়ি বেশ নান্দনিক কারুকাজ খচিত। প্রতিদিন দেশ বিদেশের শতশত পর্যটক আসে এই বাড়িটি দেখতে। বাড়িটি স্কোপযে শহরের প্রাণকেন্দ্র সেন্টার পয়েন্টের পাশে অস্থিত। বাড়ির মূল ফটকের পাশে আছে তেরেসার ভাস্কর্য। দর্শনার্থীরা কোন টিকেট ছাড়াই প্রবেশ করতে পারেন বাড়িটিতে। দ্বিতীয় এই বাড়ি এখন আর ব্যবহার না হলেও মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আলবেনিয়া থেকে আসা ফিলিপস নামে এক পর্যটকের সাথে মাদার তেরেসার সম্পর্কে কথা হয়। তিনি জানান, কিভাবে নির্মোহ থেকে মানব সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া যায় তার বড় উদহারন তেরেসা। তার এই আত্মত্যাগকে আমি গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি। জন্মভিটা নর্থ মেসিডোনিয়ার স্কোপিতে স্থানীয় একটি স্কুলে তার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি।মাদার তেরেসার শৈশবে পরিবার আর্থিকভাবে বেশ স্বচ্ছল ছিলো। তবে ১৯১৮ সালে মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। ফলে পারিবারিকভাবে আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হতে হয়। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ তেরেসার পারিবারিক নাম ছিল অ্যাগনিস গঞ্জা বোজাঝিউ। সংসারে অভাব থাকা সত্বেও তাঁর মা তাঁদেরকে কঠোর নৈতিক মূল্যবোধ, খ্রিস্টীয় আদর্শ এবং দরিদ্র ও অভাবী মানুষদের সাহায্য করার শিক্ষা দিয়েছিলেন। এরপর মিশনারি হওয়ার ভাবনা থেকে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে ১৯২৮ সালে আয়ারল্যান্ডের রথফার্নহ্যামে ‘ইনস্টিটিউট অফ দ্য ব্লেসড ভার্জিন মেরি’ (সিস্টার্স অব লোরেটো)-তে যোগ দেন। সেখানে তিনি ইংরেজি ভাষা ও মিশনারি কাজের উপর প্রশিক্ষণ নেন। ১৯২৯ সালে ভারতে এসে দার্জিলিংয়ে নতুন দিক্ষীত নান হিসেবে ধর্মীয় প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাদীক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ১৯৩১ সালে প্রথম শপথ গ্রহণের পর তিনি কলকাতার সেন্ট মেরিজ হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে তিনি ইতিহাস ও ভূগোল পড়ানোর পাশাপাশি বাংলা ও হিন্দি ভাষা সুন্দরভাবে রপ্ত করেন।পরে ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বভার গ্রহন করেন। ১৯৪৮ সালে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করে ১৯৫০ সালে ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’ প্রতিষ্ঠা করেন। সুদীর্ঘ ৪৫ বছর তিনি বিশ্বজুড়ে দরিদ্র, অসুস্থ ও অনাথদের নিঃস্বার্থ সেবা প্রদান করেন এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। পরবর্তীতে মানবসেবায় অনন্য অবদানের জন্য তিনি শান্তিতে ১৯৭৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান। পরের বছর ১৯৮০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরত্ন’ লাভ করেন। এছাড়া মৃত্যুর পর ২০১৬ সালে পোপ ফ্রান্সিস তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সন্ত’ বা সেন্ট তেরেসা হিসেবে ঘোষণা করেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি অবিবাহিত থেকে রোমান ক্যাথলিক চার্চের একজন সন্ন্যাসিনী (নান) হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেছেন। তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসেবে, তিনি দারিদ্র্য, পবিত্রতা এবং আনুগত্যের ব্রত গ্রহণ করেছিলেন এবং নিজেকে ঈশ্বরের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। কলকাতার মাদার হাউসে মিশনারিজ অব চ্যারিটির সদর দপ্তরে ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৮৭ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। সেখানেই মহিয়সী নোবেল বিজয়ী নারীকে সমাহিত করা হয়।