খাইরুল ইসলাম নিরব, ঝিনাইদহ: উদ্বোধনের আট বছর পেরিয়ে গেছে। তিনতলা ভবন দাঁড়িয়ে আছে, কক্ষে কক্ষে সাজানো চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রস্তুত শয্যা, চিকিৎসক ও কর্মীদের থাকার জন্য ডরমেটরি, এমনকি বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প হিসেবে রয়েছে জেনারেটরও। এত আয়োজনের পরও চিকিৎসক সংকটে স্বাস্থ্যসেবা চালু হয়নি ঝিনাইদহের চারটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে। ফলে প্রসূতি নারী ও নবজাতকের চিকিৎসার জন্য দূরদূরান্ত থেকে ছুটতে হচ্ছে অন্য হাসপাতালে। এতে বাড়ছে ভোগান্তি, যাতায়াত ব্যয় ও সময়ের অপচয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবার পড়ছে সবচেয়ে বেশি বিপাকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল হাসপাতালগুলো। ২০১৮ সালে উদ্বোধনের পর স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল, গ্রামের নারীরা নিরাপদ মাতৃত্বসেবা পাবেন, জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে, নবজাতকের সেবাও মিলবে কাছেই। কিন্তু আট বছরেও সেই প্রত্যাশার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। ভবন ও অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে সরকারি এই বিনিয়োগের বড় একটি অংশ। দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলার শৈলকুপা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম দুধসর। আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। পরিকল্পনা ছিল, এই কেন্দ্র থেকেই অন্তঃসত্ত্বাদের প্রসবপূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী সেবা, প্রসূতি ব্যবস্থাপনা এবং শিশুদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হবে। কিন্তু উদ্বোধনের পর আট বছর পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসক সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ সেবাকেন্দ্র হিসেবে কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি। একই চিত্র ঝিনাইদহ সদর উপজেলার দক্ষিণ কাষ্টসাগরা, কালীগঞ্জ পৌরসভা এলাকা এবং শৈলকুপার কাঁচেরকোল গ্রামে নির্মিত অন্য তিনটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রেও। সব হাসপাতালের তিনতলা ভবন, শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য অবকাঠামো থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নির্ধারিত সক্ষমতা অনুযায়ী সেবা দিতে পারছে না। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে চারটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ২১ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নির্মিত এসব হাসপাতালের বাস্তবায়ন করেছে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রতিটি হাসপাতাল তিনতলা বিশিষ্ট। চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন কক্ষ। রয়েছে রোগীদের জন্য শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, চিকিৎসক ও কর্মীদের আবাসনের জন্য ডরমেটরি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে জেনারেটরের ব্যবস্থাও। অর্থাৎ অবকাঠামোগত প্রস্তুতিতে ঘাটতি না থাকলেও জনবলসংকটের কারণে প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না, অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীও কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে দারিদ্র্য ও নিম্ন আয়ের অনেকেই থেকে যাচ্ছে চিকিৎসার বাইরে। কাঁচেরকোল এলাকার বাসিন্দা আবু জাফর বলেন- হাসপাতালগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে আশপাশের গ্রামের উপকৃত হবেন। প্রসূতি ও শিশুদের চিকিৎসার জন্য দূরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। দুধসর এলাকার হাফিজুর রহমান বলেন- এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ হওয়ায় ভেবেছিলাম, মা ও শিশুদের চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হবে না। কিন্তু এত বছর পার হলেও হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু হয়নি। চিকিৎসক না থাকায় প্রয়োজনের সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হোক। আরেক এলাকা দক্ষিণ কাষ্টসাগরার আমিনুল ইসলাম বলেন- হাসপাতাল আছে, ভবন আছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকলে সাধারণ মানুষ কীভাবে সেবা পাবে। প্রসূতি কিংবা শিশুর অসুস্থতার সময় দূরের হাসপাতালে যেতে হয়। এতে সময় ও টাকা দুটোই বেশি লাগে। সরকারের উচিত দ্রুত জনবল নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালগুলো কার্যকর করা। ঝিনাইদহ পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহা. মোজাম্মেল করিম বলেন-হাসপাতালগুলো চালু থাকলেও চিকিৎসক না থাকায় পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি কেন্দ্রে দুজন করে চিকিৎসক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলে সেবার পরিধি বাড়ানো সম্ভব হবে।