নিজস্ব প্রতিবেদক : সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শেষ হয়েছে গত ২১ অক্টোবর। কিন্তু দেশের সব মণ্ডপে দেবীর বিসর্জন হয়ে গেলেও, ব্যতিক্রমী এক ঘটনা ঘটেছে যশোর সদর উপজেলার কৈখালী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে। সেখানে সম্পন্ন হলো দ্বিতীয় দফার পূজা। শনিবার বিকালে দ্বিতীয় দফার বিজয়া দশমীতে একে অপরের গায়ে-মুখে সিঁদুর মাখিয়ে আনন্দ উৎসবে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে সমাপ্তি ঘটে এই আয়োজনের। আয়োজকরা জানান, গত বুধবার বিজয়া দশমীর দিন বিকালে যখন প্রতিমা বিসর্জনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তখনই মণ্ডপে ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। প্রতিমার সামনে আচমকাই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন সবিতা রাণী ঘোষ নামে এক নারী। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরেই অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। ওই নারী দাবি করেন, তার ওপর স্বয়ং দেবী দুর্গা ভর করেছেন। তিনি গ্রামবাসীকে জানান-অশৌচ থাকা লোকজন পূজা অংশ নিয়েছেন। একই সাথে পুরোহিত খেয়েছেন মাছ মাংস। ফলে মায়ের পূজা সঠিকভাবে হয়নি। তাই অমঙ্গল এড়াতে এবং গ্রামের কল্যাণে নতুন করে দিতে হবে পূজা। দৈববাণী অমান্য করলে গ্রামে ঘটবে বড় বড় দুর্ঘটনা। মন্দির প্রাঙ্গণে সেইদিন উপস্থিত শত শত লোক এমন দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে যান। এরপর তারা সিদ্ধান্ত নেন পুনরায় নিয়ম মেনে মায়ের পূজা করার। দৈববাণী রক্ষা ও গ্রামের মঙ্গল কামনায় প্রতিমা বিসর্জন না দিয়ে, মণ্ডপেই শুরু হয় দ্বিতীয় দফার আয়োজন। প্রতিমা বিসর্জন স্থগিত রেখে নতুন পুরাহিতের মাধ্যমে প্রথম দফার নিয়ম অনুসারেই চার দিনে শেষ হয় মহাষষ্ঠী থেকে মহানবমী। সব শঙ্কা কাটিয়ে শনিবার সকালে দ্বিতীয় দফার দশমীর ঘট পূজা আর বিকালে পূতিমা বির্সাজনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে এই আয়োজনের। কৈখালী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক গণেশ কুমার বলেন, ‘গত ১৬ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশের মত এই মন্দিরেও দুর্গা পূজা হয়েছে। ২১ অক্টোবর বিকেলে প্রতীমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বিভিন্ন পূজা শেষে নারীরা সিঁন্দুর খেলাও শুরু করেন। এসময় সবিতা রানী ঘোষ নামে এক বিধবা নারী অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। জ্ঞান হারিয়ে ফেললে, তাকে চোখে মুখে পানি দিয়ে জাগ্রত করি। এর পরেই ওই নারী দেয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে বলা শুরু করেন ‘এই মন্দিরে দুর্গাপূজায় ত্রুটি ছিল। সঠিকভাবে পূজা হয়নি। অশৌচ থাকা (পরিবারের সন্তান জন্মের এক ও কেউ মারা গেলে এক বছর অশৌচ মানা হয়) লোকজন পূজা অংশ নিয়েছেন। একই সাথে পুরোহিত মাছ মাংস খেয়ে পুজো করেছে। এজন্য মায়ের পূজা সঠিকভাবে হয়নি। পুনরায় পূজা না করলে গ্রামবাসীর বড় ধরণের ক্ষতি হবে। মন্দিরের সেক্রেটারির ভাষ্য-এই ঘটনা ঘটার আগের রাতে আমাদের এলাকার কিছু মানুষ নড়াইলে পূজা দেখতে যাচ্ছিলো; তখনই তারা দুর্ঘটনায় পতিত হন। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। সবিতা রানীর ভাষ্য অনুযায়ী অশৌচ থাকা ব্যক্তিদের খোঁজ নিয়ে জানা যায় তারা পূজা দিয়েছে। একই সাথে এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটার বিষয়টি সামনে আসলে মন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত শত শত লোক ভয় পেয়ে যান। এরপর তারা সিদ্ধান্ত নেন পুনরায় নিয়ম মেনে মায়ের পূজা করা হবে। প্রতিমা বিসর্জন স্থগিত করে গত শুক্রবার ও শনিবার ঘটে সপ্তম, অষ্টমী, নবমী ও দশমী পূজা করা হয়েছে। শনিবারও সকালে বিজয়া দশমী ও সিদুঁর দান সম্পন্ন হয়েছে।’ যশোর শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কৈয়খালি গ্রাম। এই গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শত বছর ধরে প্রতি বছর দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছে। শনিবার দুপুরে মন্দির প্রাঙ্গনে এলাকাবাসীর জটলা। মন্দিরের সভাপতি মিলন কুমার রায় বলেন, ‘এক শ’ বছরের বেশি সময় ধরে দূর্গা পূজার আয়োজন হলেও এবার ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। খরচ বেশি হলেও সবার মঙ্গলের জন্য ফের পূজার আয়োজন করা হয়েছে। তবে মানুষের মধ্যে এক ধরণের শঙ্কা আতংক ছিলো। তবে সব বিতর্ক ছাপিয়ে দেবী দূর্গাকে নতুন করে পূজা করা হয়েছে। বির্সজনের মাধ্যমে দেবি ভুলত্রুটি ক্ষমা করে পাড়ার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শান্তিতে ভরিয়ে দিবে এমনটা আশা তার।’ মন্দিরের পুরহিত উজ্জল কুমার চ্যাটার্জী বলেন, ‘শাস্ত্রে দ্বিতীয় দফায় দুর্গাপূজার নিয়ম না থাকলেও এলাকার মানুষের মঙ্গল কামনায় ঘট পেতে ফের পূজার আয়োজন করা হয়। দেবীর তুষ্টি আর গ্রামের সার্বিক কল্যাণের আশায় শনিবার বিকালে ধর্মীয় আচার মেনে স্থানীয় ভৈরব নদে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। অলৈাকিক ঘটনার প্রেক্ষিতের কৈয়খালি গ্রামে দুইবার দুর্গা পূজার আয়োজন করা হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসের ভিত্তিতে এলাকার মানুষের মঙ্গল কামনায় তারা পূজা করেছে। এটা ব্যতিক্রমী ঘটনাও ঘটে বলছেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার ঘোষ।