স্পন্দন ডেস্ক : ‘গুম’ হয়ে যাওয়া বাবার জন্য যখন তাদের সন্তানরা কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন, তখন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও নিজের আবেগ সামাল দিতে পারেননি। শনিবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘গুম-খুনের শিকার’ নেতাকর্মীদের পরিবারের সম্মিলন অনুষ্ঠানে এ দৃশ্য দেখা যায়। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ এবং ‘মায়ের ডাক’ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে মতবিনিময়ের সময় এখনও নিখোঁজ অনেকের পরিবারের স্বজনরা তাদের প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি প্রকাশ করেন। হারানো সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আশা ছাড়েননি মায়েরা। অনুষ্ঠানে সে কথা আবারও তুলে ধরেন তারা। তাদেরই একজনকে দেখা যায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করতেও। বংশাল থানা ছাত্রদলের নেতা পারভেজ হোসেন নিখোঁজ ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে। সেই থেকে তার স্ত্রী ফারজানা আক্তার ও তাদের মেয়েসহ পরিবারের সদস্যরা এখনও তার অপেক্ষায়। অনুষ্ঠানে মাকে নিয়ে এসেছিলেন পারভেজের মেয়ে আদিবা ইসলাম হৃদি। বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণের আকুতির কথা তুলে ধরেন তিনি। ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর শাহবাগ থেকে ‘গুম’ হন বংশাল ছাত্রদলের এই নেতা। তাকে ডিবি (গোয়েন্দা) পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করে আসছেন স্বজনরা। এ গুমের ঘটনার বিচার এবং পারভেজের সন্ধান দাবি করে আসছেন তারা। এত বছর পেরিয়ে গেলেও বাবার সন্ধান পাননি তার কন্যা হৃদি। অনুষ্ঠানে কান্না বিজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, “বছর যায়, নতুন বছর আসে কিন্তু আমাদের বাবা আর আসে না। ৫ অগাস্টের পর এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেল, কিন্তু আমি বাবাকে ফিরে পাইনি।” বাবাকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্নের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার, কিন্তু সেই স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি। আমি কি বাবাকে ফিরে পাবো না? আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে আপনারাই বলুন?“ এই কথা বলেই অঝোরে কাঁদতে লাগলো হৃদি। এ সময়ে মঞ্চে বসা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। টেবিলে রাখা টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু নিয়ে চশমা খুলে চোখ মছুতে দেখা যায় তাকে। পুরো অনুষ্ঠানস্থলে আবেগঘন পরিস্থিতি তৈরি হয়। অনুষ্ঠানে আসা অতিথিরাও হৃদির সঙ্গে এভাবে তার কষ্ট-বেদনাকে ভাগাভাগি করেন। অনুষ্ঠানে ‘গুম’ হওয়া বাবার কথা বলতে এসেছিলেন আরেক মেয়ে সাফা। মাত্র দুই মাস বয়সে নিখোঁজ হয় তার বাবা মো. সোহেল। তিনিও বংশাল ছাত্রদলের নেতা ছিলেন। ওই ইউনিটের সহসভাপতি ছিলেন। ২০১৩ সালের পর থেকে তার খোঁজ পায়নি পরিবার। কাঁদতে কাঁদতে সাফা বলে, ‘‘এক যুগ ধরে বাবার জন্য অপেক্ষা করছি। অনেক জায়গায় গিয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাইনি বাবার।’’ তার সমবয়সীদের যখন বাবারা হাঁটা শেখান, তখন নিজের বাবাকে খুঁজে বেড়ানোর আক্ষেপ তুলে ধরে সাফা বলে, ‘‘আমি আর কত দিন খুঁজব বাবাকে?” সাফা ও হৃদির মতো অনেকের প্রিয়জন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিচারবহির্ভূত ‘হত্যা ও গুমের’ শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ সন্তান, কেউ ভাই, আবার কেউ স্বামীকে। বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র ‘গুম’ হওয়া পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিএনপি এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিল। স্বজন হারানোদের সঙ্গে অনুষ্ঠানস্থলে কেঁদেছেন আয়োজকদেরও অনেকে। তাদের দীর্ঘশ্বাস নাড়া দিয়েছে অন্যদেরও।