নিজস্ব প্রতিবেদক : উদীচী যশোরের বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের ৫০ বছর পদার্পণ উপলক্ষে এ বছর দুই দিনব্যাপী বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সংগঠনটি। বিশ্বব্যাপী চলমান অরাজক পরিস্থিতি, সহিংস ঘটনাপ্রবাহকে মাথায় রেখে সব অপশক্তির বিনাশ কামনা এবং অসাম্প্রদায়িক,বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ ও হাসি-গানে মুখরিত সুখী-সুন্দর বাংলাদেশ গঠনে উদীচী যশোরের নববর্ষ উৎসবের এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রজ্ঞাময় আলোকে তিমিরবিনাশী প্রভাত হোক’। যার সারমর্ম- ‘জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত এমন এক সকাল আসুক, যা জীবনের সব অন্ধকার আর অজ্ঞতাকে মুছে দেবে।’ এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে যে উৎসবে তিন শতাধিক শিল্পী অংশগ্রহণ করবে। বিগত ৪৯ বছরের ধারাবাহিকতায় এবছরও যশোর পৌর উদ্যানে ভোর ৬টা ৩১ মিনিট থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এবং বৈকালিক অনুষ্ঠান দুপুর ৩টা ১ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত উপস্থাপন করবে তাদের পরিবেশনা। বাংলা নববর্ষবরণ উৎসবের বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময় নানা অনুষ্ঠানমালা নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী যশোর জেলা সংসদের মিলনায়তনে রোববার দুপুরে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে উৎসব অনুষ্ঠানের সার্বিক বিষয় উপস্থাপন করে উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক ও নববর্ষ উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন- স্বাধীনতার পর থেকে ৪৯ বছর যাবৎ এই শহরের মানুষকে একই সূত্রে গেঁথে পৌর উদ্যানে বিশাল আয়োজনে সম্পৃক্ত করে আসছে। ১৯৯৯ সালে যশোরে অনুষ্ঠিত উদীচীর জাতীয় সম্মেলনে বোমা হামলা চালিয়েও উদ্যোগকে থামিয়ে রাখা যায়নি। প্রতিবছর হাজারো মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় উদীচীর প্রভাতি অনুষ্ঠানস্থল পৌর উদ্যান। তিনি বলেন, উৎসব সুষ্ঠু ও সুন্দর এবং সফল করার লক্ষ্যে উদীচী যশোরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান হিরুকে আহ্বায়ক করে বর্ষবরণ উৎসব উদযাপন পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। যে পর্ষদে ১০টি উপপর্ষদ অবিরাম কাজ করে চলছে। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন- ‘ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা উদীচী ও বাঙালি সংস্কৃতি বিভিন্ন সময় বারবার আক্রান্ত হয়েছে, সাম্প্রতিক ঢাকায় উদীচী কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ ছিল বর্বর ঘটনা। এর ফলে সংগঠনের এত বছরের কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ নথি, নাটক ও গবেষণাধর্মী পাণ্ডুলিপি, চিত্রকলা ও বাদ্যযন্ত্রসহ সব সামগ্রী পুড়ে ভস্মীভূত হয়। এ বিষয়কে সামনে রেখে আগুনে পোড়া ক্যানভাসে এবছরের বর্ষবরণ উৎসবের আমন্ত্রণপত্র তৈরি করা হয়েছে। যা ইতোমধ্যে অতিথিদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন-ইতোমধ্যে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসবের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বিগত বছরের মতো এবারও যশোর পৌর উদ্যানে সকাল-বিকেল দুই পর্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। এবারের আয়োজনে থাকছে ‘আহির ভৈরবী’ রাগে বৈশাখ আবাহানের পর সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হবে রবিঠাকুরের সেই চিরায়ত ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। এরপর পাঁচ গীতিকবির গান, শিশুতোষ পরিবেশনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটক, বাংলা হারোনা দিনের গান, জীবনমুখী গান, লোকসংগীত, আধুনিকগান ও লোকনৃত্য। পরিবেশিত হবে সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক অসংগতির প্রতিবাদে গণসংগীত। এছাড়া পল্লিকবি জসীম উদ্দীন রচিত গল্প অবলম্বনে ‘বেদের মেয়ে’-এর উপর নির্মিত নৃত্যনাট্য ও যাত্রাপালা ‘শাহজাহান’। উদীচীর পক্ষ থেকে ডা. কাজী রবিউল হক নববর্ষ পদক প্রদান করা হবে। এবার পদকের জন্য মনোনীত করা হয়েছেন উদীচী যশোর জেলা সংসদের সহসভাপতি শেখ মাসুদ পারভেজ মিঠু। সংবাদ সম্মেলনে উদীচী যশোরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান হিরু যশোরে বর্ষবরণ উৎসবের ইতিহাস সম্পর্কে জানান- যশোর উদীচী ঢাকার বাইরে প্রথম শাখা সংগঠন যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৯ সালে। জন্মের তিন বছর পর ১৯৭২ সাল থেকে উদীচী যশোরের আয়োজনে শুরু হয় বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ উদযাপন। তৎকালীন কার্যালয় যশোর আমীন হোটেলে এ অনুষ্ঠান হয়। পরের বছর নেতাজী সুভাষ চন্দ্র রোডস্থ ক্যালট্যাক্সের সামনে হয় বর্ষবরণানুষ্ঠান। এরপর ১৯৭৪ সালের নববর্ষ আয়োজনের প্রস্তুতির সময় তৎকালীন উপদেষ্টা ডাক্তার কাজী রবিউল হক প্রস্তাবে পৌর উদ্যানে প্রকৃতির মাঝে এ অনুষ্ঠান শুরু হয়। শুরুর সেই অনুষ্ঠান হয়েছিল দুই পুকুরের মাঝে সেতুর উপর। পরের বছর হয় পৌর উদ্যানে অবস্থিত ঝর্ণার পাশে। এভাবেই এ উদ্যানে এবার পাঁচ দশক পূর্ণ হয়েছে। তিনি বলেন- বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য তার সংস্কৃতি। আর এ সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ পেয়েছে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে। নববর্ষ বর্তমানে অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যে উৎসবে সকল জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমানভাবে অংশ নেয়। আর এ উৎসব আয়োজনে যশোর পথিকৃতের ভূমিকা পালন করছে। ৪৯ বছর আগে পৌর উদ্যানে বর্ষবরণের যে যাত্রা শুরু করেছিল তা আজ শ্রেষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক উৎসবে রূপ নিয়েছে। যশোরের এই সার্বজনীন উৎসব আয়োজনের শুরুটা উদীচীর দ্বারা হলেও সমস্ত যশোরের মানুষ যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস নিয়ে এ উৎসবকে গ্রহণ করেছে- এটা উদীচীর বড় পাওয়া। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন উদীচী যশোরের বর্ষবরণ উৎসব-১৪৩৩ পর্ষদের যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর কবির, আমন্ত্রণপত্র তৈরি কমিটির আহ্বায়ক আসিফ আকবর নিপ্পন, আপ্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক রাজিব উদ্দিন খান।