নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বরণে প্রস্তুত যশোর। আজ ২৭ এপ্রিল সোমবার তিনি যশোরে আসছেন। তাকে বরণ করে নিতে সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে যশোর জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, জেলা বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোসহ যশোরস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট। এই সফরে তিনি তার পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত উলাশী যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন ও যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণকাজের উদ্বোধন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই আগমন ও জনসভা নিরাপদ, নির্বিঘœ ও সফল করতে আসা যাওয়ার পথে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাসহ কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনা হয়েছে অনুষ্ঠানস্থলগুলো। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে। তারা দলীয় প্রধানের ব্যানার ফেস্টুনের মাধ্যমে যশোর আগমনকে স্বাগতম জানাচ্ছেন। সব জায়গায় এখন সাজ সাজ রব উঠেছে।
এদিকে, ঈদগাহ ময়দানে প্রধানমন্ত্রীর জনসভা ঘিরে যশোর শহরে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটবে বলে টার্গেট করেছে জেলা বিএনপি। জনসভা ঘিরে বাস, প্রাইভেট, মাইক্রো ও মোটরসাইকেল মিলিয়ে ৫ হাজারের মত যানবাহন আসবে। এজন্য ইতিমধ্যে ১০টি পার্কিং স্পট নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে এমপি মন্ত্রী ও ভিআইপিদের জন্য আলাদা পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও থাকবে।
জেলা প্রশাসন ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল সোয়া ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যশোর বিমান বন্দরে অবতরণ করবেন। সেখান থেকে সরাসরি যাবেন জেলার শার্শা উপজেলার উলাশীতে। সেখানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত উলাশী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করবেন। একই সঙ্গে পুনঃখননস্থলে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে যোগ দেবেন তিনি। সেখান থেকে ফিরে বেলা সোয়া ১টায় যশোর শহরে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
বেলা দেড়টায় প্রধানমন্ত্রী যশোরের পৌনে দুইশ বছরের প্রাচীন ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করবেন। এরপর যশোর সার্কিট হাউজে নামাজ ও দুপুরের খাবারের বিরতির পর বিকেল সাড়ে তিনটায় যশোর ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে জেলা বিএনপির সাথে সভা করবেন তিনি। সন্ধ্যায় ঢাকার উদ্দেশে যশোর ছাড়বেন।
এদিকে, বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকার প্রধানের আগমনের এই দিন যশোর উৎসবের শহরে পরিণত হবে। শহরে ও শহরতলিতে, গ্রাম পর্যায়েও চলছে মাইকিং। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে আশায় বুক বেঁধেছেন যশোরবাসী। এই সফর যশোরসহ এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থা এবং মানুষের জীবনযাত্রায় মান উন্নয়ন ঘটবে এমনটিই আশা সবার। নানা প্রত্যাশা ও দাবি দাওয়া বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি দিয়ে উন্নয়ন ও দিন বদলের নেতৃত্ব দেবেন বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আশাবাদ এ অঞ্চলের গণমানুষের। এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি যশোর উপশহর ডিগ্রি কলেজ মাঠে বিশাল নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম বলেন, “প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো যশোর সফরে আসছেন তারেক রহমান। এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হিসেবে তিনি এ জেলায় সফর করেছিলেন।”
যশোর-৩ (সদর উপজেলা) আসনের সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর খুলনা বিভাগে এটি তারেক রহমানের প্রথম সফর। তিনি বলেন, “আমরা সৌভাগ্যবান এবং গর্বিত যে, এই সফরটি যশোর থেকেই শুরু হচ্ছে।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “সকালে বিমান থেকে নেমে তারেক রহমান প্রথমে তার পিতার স্মৃতিবিজড়িত উলাশী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। এরপর সেখান থেকে ফিরে এসে যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
“সফরসূচির অংশ হিসেবে তিনি যশোরের ঐতিহ্যবাহী পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করবেন এবং পরে যশোর ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত জনসভায় অংশ নেবেন।” ঢাকায় ফেরার আগে তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কিছু সময় কাটাবেন বলেও জানান খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আশা প্রকাশ করে বলেন, “আগামীকাল একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর আয়োজন সম্পন্ন করতে আমরা সক্ষম হবো।”
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, “যশোরের অধিকাংশ উন্নয়ন বিএনপি সরকারের আমলেই হয়েছে বলে স্থানীয়দের মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে।
“সেই ধারাবাহিকতা রক্ষায় কাজ করছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে, বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।” দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে ঘিরে যশোরবাসীর প্রত্যাশা অনেক।”
যশোরবাসীর একগুচ্ছ দাবি:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন ঘিরে একগুচ্ছ দাবিতে সোচ্চার যশোরবাসী। দাবির মধ্যে রয়েছে যশোর সিটি কর্পোরেশন, যশোর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, যশোর জেনারেল হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ ও কিডনি ডায়ালোসিস সেন্টার চালু, ভোরবেলা বেনাপোল থেকে যশোর-নড়াইল-ঢাকা রুটে আরো একটি আন্তঃনগর ট্রেন এবং দর্শনা (গেদে সীমান্ত) থেকে যশোর-নড়াইল-ঢাকা রুটে দুইটি আন্তঃনগর ট্রেন দিতে হবে। ঢাকা-নড়াইল-যশোর-বেনাপোল বা দর্শনা সীমান্ত রুটে অন্তত: একটি লোকাল ট্রেন দিতে হবে। দর্শনা থেকে খুলনা পর্যন্ত ডবল লাইন রেলপথ চালু করতে হবে; সুবিধাজনক যে কোন স্টেশনে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল (আইসিটি) স্থাপন করতে হবে; সকল আন্তঃনগর ট্রেনে সাধারণ বগি যুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ যশোর শাখার সাধারণ সম্পাদক তসলিম উর রহমান বলেন, যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পার্শ্ববর্তী ঝিনাইদহ, নড়াইল, মাগুরা জেলাসহ দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। কিন্তু হাসপাতালটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। চিকিৎসা সেবা ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। করোনাকালীন এখানে স্থানীয়ভাবে ১০ শয্যার অপূর্ণাঙ্গ আইসিইউ চালু করা হয়। হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ’র সমস্ত যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন পড়ে আছে। এর প্রধান কারণ আইসিইউ পরিচালনার জন্য কোন জনবল নিয়োগ করা হয়নি। ফলে চিকিৎসা সুবিধা থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। অপরদিকে মূল্যবান যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে, হাসপাতালে একটি কিডনি ডায়ালোসিস সেন্টার অনুমোদন দেয়া হলেও তা চালু করা কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এতে জেলার ৩১ লাখ মানুষসহ পার্শ্ববর্তী চার জেলার ৭০ লক্ষাধিক মানুষ আধুনিক চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত।
এ বিষয়ে যশোর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির নেতা অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত যশোর বাংলাদেশের কৃষি ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ধান, পাট, তেলবীজ, খেজুরগুড়ের পাশাপাশি সবজি উৎপাদনে যশোর অনন্য। ঝিকরগাছার গদখালির বাণিজ্যিক ফুল উৎপাদন দেশের ৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। চাঁচড়ার রেণুপোন উৎপাদন দেশব্যাপী মৎস্যচাষিদের কাছে সুপরিচিত। গবাদি পশুপালন ও পোল্ট্রি শিল্পের মাধ্যমে আমিষের চাহিদা পূরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। যশোর জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সময়ের দাবি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি বিপ্লবের সূতিকাগার হিসেবে ভূমিকা রাখবে।