বিল্লাল হোসেন : যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসাসেবা নেই। সামান্য জটিল রোগী ভর্তি হলেই ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে অন্যত্র রেফার্ড করেন। চিকিৎসাধীন রোগীদের কিছু ওষুধ বিতরণ ও প্রেসার মেপে দায়িত্ব শেষ করেন সেবিকারা। এভাবেই চলছে সেখানকার চিকিৎসাসেবা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপে দায়সারা চিকিৎসাসেবার অবসান হতে চলেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি স্বাস্থ্য সচিব মোঃ কামরুজ্জামান চৌধুরীকে যশোর করোনারি কেয়ার ইউনিটে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিন সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে পরিপূর্ণ সেবা প্রদানে যশোরবাসীকে দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন যশোর-৩ সদর আসনের সংসদ সদস্য বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এরপর স্বাস্থ্য সচিবকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। সিসিইউতে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হওয়ার পর নতুন উন্নয়নে যশোরবাসীর আরেকটি প্রত্যাশা পূরণ হবে।
জানা গেছে, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে যশোরে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘করোনারি কেয়ার ইউনিট’ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০০৫ সালে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিটের তিনতলা ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়। পরে ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও বন্ধ ছিলো চিকিৎসা কার্যক্রম। পরে পর্যায়ক্রমে ইকোকার্ডিও গ্রাম, ইটিটি, কার্ডিওয়াক মনিটর, কালার ডপলার, ডিজিটাল ইসিজি মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির বরাদ্দ মেলে। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২৪ চিকিৎসক ৫৬ নার্স ও ১৪৩ কর্মচারী নিয়োগের চাহিদাপত্র পাঠায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর করোনারি কেয়ার ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২০১৯ সালে সর্বশেষ ৭৮ জন জনবল চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়। এরমধ্যে চিকিৎসকের পদ ছিলো ২০, সেবিকার পদ ৩০ ও ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির পদ ছিলো ২৮টি। কিন্তু ২০২০ সালে মাত্র ২৮ পদের অনুমোদন মেলে। এরমধ্যে ১২ জন চিকিৎসক, ১ জন নার্সিং সুপারভাইজার, ১২ জন সেবিকা ও ২ জন কার্ডিওগ্রাফার। চিকিৎসকের পদে রয়েছেন কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ১, জুনিয়র কনসালটেন্ট ১, আবাসিক চিকিৎসক ১, সহকারী রেজিস্ট্রার ১, সহকারী সার্জন ও মেডিকেল অফিসার ৬ ও ইমাজেন্সি মেডিকেল অফিসার ২ জন। এরমধ্যে ১ জন জুনিয়র কনসালটেন্ট, ১ জন সহকারী রেজিস্ট্রার ও ১ জন রেডিওগ্রাফার যোগদান করেছেন। বাকি পদগুলো শূন্যই রয়েছে। চালুর আগেই সেখানে স্থাপিত আধুনিক যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হয়ে যায়। এরপর থেকে জোড়াতালি দিয়ে চলতে থাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটের চিকিৎসাসেবা।
সূত্র জানায়, করোনারি কেয়ার ইউনিটে ২৮টি বেডে রোগী ভর্তির ব্যবস্থা রয়েছে। সেই অনুযায়ী প্রত্যেক রোগীর জন্য একজন চিকিৎসক ও ২ জন সেবিকা থাকার কথা। তবে বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। এখনো পর্যন্ত নিজস্ব কোন জনবল নেই বললেই চলে। হাসপাতালের চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মচারী দিয়ে হয় সেখানে চিকিৎসা কার্যক্রম চলে। ১২ পদের বিপরীতে মাত্র দুই জন চিকিৎসক আছে। বর্তমানে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে হার্টজনিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীরা ক্লিনিকে ছুটছেন। রোগীর স্বজনেরা বলছেন, সরকারি এ চিকিৎসা কেন্দ্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করাতে পেরে দক্ষ প্যাথলজিস্ট ও টেকনিশিয়ানের সেবা থেকে বঞ্চিত হবার পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। আবার যন্ত্রপাতির অভাবে উন্নক চিকিৎসা পাচ্ছেন না হৃদরোগে আক্রান্তরা।
একাধিক রোগী ও স্বজনরা জানান, প্রাণঘাতী হৃদরোগে আক্রান্ত প্রত্যেক রোগী যশোর করোনারি কেয়ার ইউনিটে আসেন উন্নত চিকিৎসার জন্য। রোগী ও স্বজনরা প্রত্যাশা করেন সংকটাপন্ন মুহূর্তে পাবেন অক্সিজেন, ভেনটিলেশন ও কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস পরিচালনসহ উন্নত সব ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবে উন্নত চিকিৎসাসেবা নেই। সকালে চিকিৎসকরা রাউন্ডে আসেন। কিন্তু বিকেলের পর থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ কোনো চিকিৎসকের দেখা মেলে না।
এদিকে, যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা করোনারি কেয়ার ইউনিটে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা। অবশেষে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের হস্তক্ষেপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সেই প্রত্যাশা পূরণ হতে চলেছে।
যশোরের সিভিল সার্জন মাসুদ রানা জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত তাদেরকে অবহিত করে অফিস ওয়ার্ক শুরু করতে বলেছেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশের সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে উপস্থিত স্বাস্থ্য সচিবকে যশোরের করোনারি কেয়ার ইউনিট দ্রুততম সময়ের মধে পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর নির্দেশ দিয়েছেন বলে শুনেছি। তবে এখনো অফিসিয়ালভাবে চিঠি আসেনি।
উল্লেখ্য, যশোর করোনারি কেয়ার ইউনিটে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা না থাকার বিষয়ে গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য প্রদান করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী যশোর-৩ (সদর) আসনের এমপি অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাবার পর বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অনুরোধ করেছিলেন যশোরে একটি পূর্ণাঙ্গ করোনারি কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার। দেশনেত্রী সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে করোনারি কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ‘বিল্ডিং হলো, বাক্স ভর্তি মেশিন আসলো কিন্তু সরকারের পালাবদলে ১৯ বছরে সেই মেশিন আর বাক্স খুলে চালু হলোনা’। তাই এই ১৯ বছরে প্রতিদিন ঢাকা এবং খুলনায় যাওয়ার পথে হৃদরোগে আক্রান্ত বহু রোগীকে জীবন দিতে হয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য আনার পথে ভাঙায় ইন্তেকাল করেন যশোর সদর উপজেলার কচুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন ইরান।