নিজস্ব প্রতিবেদক : যশোর-খুলনা মহাসড়কের গা ঘেঁসে গড়ে উঠেছে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চামড়ার হাট রাজারহাট। এই হাটের এক কোণে ৯০ পিচ গরু ও ৫৫ পিচ খাসির চামড়া এনেছেন নড়াইলের লক্ষিপাশার রনজিত দাস। কাঠফাটা রোদ্দুরে মাথায় গামছা পেছিয়ে হাঁটু গেড়ে বসেছে চামড়ার পাশে। পাশে দাঁড়িয়ে তার বড় ছেলে রোমেন দাস। একটু পর পর তার চামড়ার কাছে আড়ৎদাররা আসছেন; আর উল্টে পাল্টে দেখছেন। তবে আড়ৎদাররা যে দাম বলছেন; তাতে বিক্রি করতে রাজী নন রনজিত। অন্তত আধা ঘন্টায় পাঁচ আড়ৎদার তার কাছে আসলেও কাউকেও চামড়া দিতে রাজী হননি তিনি। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি জানান, ‘বাড়ি বাড়ি ঘুরে ৫শ’ থেকে ৯ শ’ টাকা পর্যন্ত গরুর চামড়া কিনেছি। আর খাসির চামড়া ৫০ থেকে দেড় শ’ টাকা পর্যন্ত। এরপর প্রতিটি গরুর চামড়ায় লবণ লেগেছে এক শ’ টাকার। খাসির চামড়ায় ২০ টাকা। লবণ শ্রমিক, বাজারে আনতে সব মিলিয়ে প্রতিটি চামড়ায় খরচ হয়েছে দেড় শ’ থেকে দুই শ’ টাকা পর্যন্ত। অথচ হাটে গরুর চামড়া সর্বোচ্চ বলছে আট শ’ টাকা। আর খাসি ৫০ টাকা। ক্ষোভের স্বরে বলছিলেন- সরকারের রেট অনুযায়ী আমার প্রতিটি গরুর চামড়ার দাম হয় ১৫শ’ থেকে ১৭শ’ টাকা। অথচ বাজারে এনে দাম বলছে অর্ধেক। তাদের দামে চামড়া দিলে আসলও থাকবে না! যশোরের রাজারহাটে ঈদ পরবর্তী প্রথম হাট ছিলো শনিবার। কাঁকডাকা ভোর থেকেই খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ও ঢাকার গোপালগঞ্জ রাজবাড়ি থেকে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন যানবাহন ভর্তি করে চামড়া নিয়ে এসেছেন। অন্তত ১৫ হাজার চামড়া উঠলেও বাইরের পাইকার ও ট্যানারি মালিকের প্রতিনিধিরা না আসায় বেঁচাকেনা জমেনি। সরকার নির্ধারিত মূল্য উপেক্ষা করে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অর্ধেকেরও কম দামে চামড়া কিনছেন বলে অভিযোগ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোও। সরকার এবার জেলা পর্যায়ে গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া খাসির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে মাঝারি গরুর চামড়ার মূল্য হওয়ার কথা ৯৫০ থেকে ১২০০ টাকা এবং বড় গরুর চামড়া ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ যশোরের বাজারে মাঝারি গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ আর বড় সর্ব্বোচ ৮০০ টাকা। সেই অনুযারি সরকারের নির্ধারিতের চেয়ে যশোরের বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকা ফুট। চামড়া বিক্রেতাদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারি রেট কার্যকরে প্রশাসনের কোনো তদারকি না থাকায় ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করছেন। তবে চামড়া ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারিমালিকরা সেই দামে চামড়া কিনতে রাজি নন। বাগেরহাট থেকে আমজেদ বিশ্বাস নামে এক মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রিক্যাপে করে ৪০০ গরুর চামড়া এনেছি। প্রতিটি চামড়া আড়ৎদাররা দিতে চাচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা করে। সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি হলে প্রতি গরুর চামড়ার দাম পেতাম ১ হাজার ২৫০ টাকার বেশি। কিন্তু চামড়ার পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরকারি বেঁধে দেওয়া রেটের বাইরে নিজেদের মতো দাম বলে চামড়া কেনাবেচা করছেন।’ এই ব্যবসায়ীর ভাষ্য- প্রতিটি গরুর ৩০ থেকে ৩৫ ফুট পর্যন্ত চামড়া হয়। সেই ক্ষেত্রে সরকারি রেটে চামড়ার দাম হবে ২১ শ’ টাকা। অথচ যশোরের বাজারে সর্ব্বোচ বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে এক হাজার। তাহলে ফুট পড়ছে ২৮ টাকা পর্যন্ত। সরকারি রেট কার্যকর হলে ছোট ব্যবসায়ীরা লাভবান হতো।’ রমেন দাস নামে আরেক মৌসুমি ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রতি বছর লস করে ব্যবসা করে যাচ্ছি। সিন্ডিকেটে আমাদের ব্যবসাটা একটি গোষ্টি শেষ করে দিচ্ছে। কোন সরকারই এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলো না।’ সরকারের নির্ধারিত দামে চামড়া কিনতে পারছেন না এমন প্রশ্নে গিয়াজউদ্দিন নামে আড়ৎদার বলেন, ‘সরকার যে রেট দেয়; তার চেয়ে ২০ টাকা কমে আমাদের চামড়া কিনতে হয়। কেননা কাচা চামড়া কিনে লবণজাত, শ্রমিক ও ঢাকাতে পৌচ্ছানো পর্যন্ত প্রতিটি চামড়া দুইশ’ টাকা পর্যন্ত পড়ে যায়। আমরা ট্যানারিমালিকদের কাছে সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করতে পারছি না। যে কারণে সরকারি বেঁধে দেওয়া দামে চামড়া কেনাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।ট্যানারির মালিকের প্রতিনিধিরা তাদের বলছেন, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কেমিক্যালের দাম বেড়েছে। এ জন্য তারা সরকারি দাম দিতে পারছেন না। লবণ ও শ্রমিকের মজুরি বেশি। ফলে দিন দিন চামড়ার দাম কমে যাচ্ছে। রাজারহাট হাট ইজারাদার রাজু আহম্মেদ বলেন, ‘ঈদ পরবর্তী প্রথম হাট হওয়াতে সেই পরিমান চামড়া উঠেনি। বাইরের আড়ৎদার বা ট্যানারি মালিকের প্রতিনিধিরা না আসাতে বিক্রিও হয়নি ভালো। আশা করছি আগামি হাটে পর্যপ্ত চামড়া আমদানি হবে; পাইকাররাও আসবে। সেই দিন জমজমাট ব্যবসা হবে।’ ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার বসে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল সর্ববৃহৎ এই হাট। তিন শতাধিক আড়ৎদারের মাধ্যমে ঈদ মৌসুমে লক্ষাধিক পিস চামড়া বিক্রি হয় এখানে।