বিল্লাল হোসেন : যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের কারণে ফের অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) হাসপাতালের মহিলা সার্জারী ওয়ার্ডে অগ্নিকান্ডে কেউ হতাহত হননি। বারবার অগ্নিকান্ডের ঘটনার নেপথ্য কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘদিন বৈদ্যুতিক বোর্ড সংস্কার না করা, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও ত্রুটিপূর্ণ সংযোগ তারই শর্ট সার্কিটের মূল কারণ বলে সূত্রের দাবি। কর্মকর্তারা বলছেন, ফ্যানের ওয়্যারিংয়ে এসির ব্যবহার করায় সংযোগে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে যে সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হতে পারে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১২ টার দিকে মহিলা ওয়ার্ডের একটি বেডের পাশে হঠাৎ করে সুইচ বোর্ডে ধোঁয়া বের হতে থাকে। পরে আগুনের সৃষ্টি হয়। এসময় চিকিৎসাধীন রোগী ও স্বজনদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ভয়ে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে থাকেন। আবার অনেক রোগী বিছানায় শুয়েই চিৎকার করতে থাকে। রোগীর স্বজন শয্যার পাশে সুইচ বোর্ডে মোবাইল ফোনে চার্জ দেওয়ার সময় ওই বোর্ডে আগুন ধরে যায়। তাৎক্ষণিক আগুন নেভানো সম্ভব হওয়ায় কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। গত বছরের ২৬ মার্চ হাসপাতালের ৩য় তলায় মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে (৯ নম্বর ওয়ার্ড) ভোরে আগুনের ঘটনা ঘটে। এসময় অধিকাংশ রোগী ঘুমের মধ্যে ছিলেন। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে হঠাৎ করে অগ্নিকান্ড হওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক রোগী ও স্বজনেরা বিছানা ছেড়ে বাইরে চলে আসে। ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল হাসপাতালের গাইনী বিভাগ ও প্রশাসনিক ভবনের সামনে হঠাৎ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। সেখানকার চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এসময় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারা দিগবিদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হওয়ায় কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। অগ্নিকান্ডের কিছুদিন আগে হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের ১৫ নম্বর বেডে হঠাৎ করে সুইচ বোর্ডে ধোঁয়া বের হতে থাকে। পরে আগুনের সৃষ্টি হয়। তাদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। তারা ভয়ে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে থাকেন। আবার অনেক রোগী বিছানায় শুয়েই চিৎকার করতে থাকে। ১৫ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন ছিলেন বাঘারপাড়া উপজেলার পাইকপাড়া এলাকার ইদ্রিস আলীর স্ত্রী শিল্পী খাতুন। তার বোন তিতলি শয্যার পাশে সুইচ বোর্ডে মোবাইল ফোনে চার্জ দিচ্ছিলেন। এসময় হঠাৎ করে বোর্ডে আগুন ধরে যায়। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে তাৎক্ষণিক আগুন নেভানো সম্ভব হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর আগে একই দিনে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ও কর্মচারী কোয়ার্টারে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক রোগীর স্বজনের চুল বৈদ্যুতিক তারে লাগলেই আগুন ধরে যায়। এসময় গোটা হাসপাতালে আগুন আতংক ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালের বহির্বিভাগের ১১৩ নম্বর কক্ষে একজন চিকিৎসক রোগীর ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার সময় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনের ধোঁয়ায় সেখানে থাকা চিকিৎসক, রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে বৈদ্যুতিক বোর্ডগুলো বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। অনেক পুরাতন এসব বোর্ড সংস্কার করা হয়না দীর্ঘদিন। তবে বোর্ডে দুই একটা করে নতুন সুইচ লাগানো আছে। এ সময় একাধিক রোগীর স্বজন জানান, হাসপাতাল মানেই অসুস্থ মানুষের বসবাস। এখানে আগুন দেখা দিলেই আতংক ছড়িয়ে পড়ে। অসুস্থ মানুষগুলো হাউমাউ করতে থাকে। যে কারণে হাসপাতালে বৈদ্যুতিক লাইন উন্নত করা জরুরিভাবে প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানিয়েছে, গণপূর্ত বিভাগ ২০০০ সালে তিনতলা ভবন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেন। এর আগে ১৯৯৯ সালে ভবনে বিদ্যুতের ওয়্যারিংয়ের কাজ করা হয়। ২০২১ ভবনে ভবনটির যাত্রা শুরু হয়। দিন দিন হাসপাতালের পরিধি বৃদ্ধি, ভারি যন্ত্রপাতি স্থাপন ও এসির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় পুরনো বিদ্যুতের সংযোগ বাড়তি চাপ নিতে পারছে না। ফলে শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকান্ডের ঘটনা বাড়ছে। হাসপাতালে দায়িত্বরত গণপূর্ত বিভাগের ইলেকট্রিশিয়ান (রাজস্ব) আব্দুস সালাম জানান, সাড়ে ১২শ কেভির ওয়েরিংয়ে অনেক চাপ হচ্ছে। এসির ব্যবহার বাড়ার কারণে লাইনে চাপ বাড়ছে। দীর্ঘদিনের পুরনো ওয়্যারিং নড়বড়ে হয়ে গেছে। ফলে বাড়তি চাপ সহ্য করতে পারছে না। যে কারণে শর্ট সার্কিট হয়ে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে। ওয়েরিং মেরামত করা না হলে যে কোন সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনার সৃষ্টি হতে পারে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স যশোরের সিনিয়র স্টেশন অফিসার ফিরোজ আহমেদ জানান, যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের বৈদ্যুতিক লাইনে নানা সমস্যা রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা বিগত দিনে অগ্নিকান্ডের পর হাসপাতাল পরিদর্শনের পর বৈদ্যুতিক বোর্ড ও সংযোগ লাইনে বেহাল অবস্থা এবং ওয়্যারিংয়ের তার দুর্বল হওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। ত্রুটিগুলো মেরামত না করায় শর্ট সার্কিটে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, বৈদ্যুতিক লাইনে নতুন করে কাজ করার জন্য গণপূর্ত বিভাগকে বলা হয়েছে। কিন্তু বরাদ্দ না থাকায় কাজ শুরু করা হয়নি। হাসপাতালে বড় ধরণের অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি হলে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবণা রয়েছে। গণপূর্ত যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম জানান, হাসপাতালের বৈদ্যুতিক লাইনের সার্ভে করা হয়েছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আর্থিক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বরাদ্দ মেলেনি। ফলে বৈদ্যুতিক লাইন উন্নত করার কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও জানান, লাইনে অতিরিক্ত চাপ ও ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে শর্টসার্কিটে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। ওয়্যারিং পুরাতনের কারণে সমস্যা হচ্ছে এটা ঠিক।