ম.ম.রবি ডাকুয়া, মোংলা : মোংলা ইপিজেডের গুয়াংজু হুয়া ফাং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিডি কোম্পানির শ্রমিক মো. গোলাম রসুলের হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় উন্নত চিকিৎসা ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন এলাকাবাসী । ১৯ জুন শুক্রবার সকালে মোংলার উত্তর চাঁদপাই বাজারে আয়োজিত এক মানববন্ধনের মাধ্যমে গুয়াংজু হুয়া ফাং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিডি কোম্পানির শ্রমিক মো. গোলাম রসুলের ভয়াবহ দুর্ঘটনার বিচার ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়েছে। কর্মরত অবস্থায় কারখানার মেশিনে হাত কনুই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর থেকেই ভুক্তভোগী শ্রমিক পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, যা শ্রম আইন ও কর্মপরিবেশের চরম নিরাপত্তাহীনতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও স্বজনদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই প্রতিবাদী কর্মসূচি থেকে কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শ্রমিক গোলাম রসুলকে সময়মতো উন্নত চিকিৎসা প্রদানে ব্যর্থতা এবং কারখানা অভ্যন্তরে কঠোর পরিশ্রমের যে পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, তা মূলত একটি পরিকল্পিত অবহেলা বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। মোংলা নাগরিক সমাজের সভাপতি মো. নূর আলম শেখের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই মানববন্ধনে বক্তারা অবিলম্বে ভুক্তভোগীর চিকিৎসার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ এবং তাকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য ইপিজেড কর্তৃপক্ষের প্রতি আল্টিমেটাম দিয়েছেন। ভুক্তভোগী শ্রমিক গোলাম রসুলের পরিবারের সদস্য ও উপস্থিত স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, কারখানার মেশিনে হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরপরই কর্তৃপক্ষ তাকে যথাযথ ও দ্রুত চিকিৎসা প্রদানে টালবাহানা করেছে, যা তার শারীরিক ক্ষতির মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতা শেখ রুস্তম আলী ও অন্যান্য নাগরিক নেতারা অভিযোগ করেন যে, কারখানায় শ্রমিক স্বল্পতার সুযোগ নিয়ে কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ সৃষ্টি করছে। এই অমানবিক কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের অভাবই গোলাম রসুলকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেশি মনোযোগী হওয়ায় কারখানা কর্তৃপক্ষ এখন এই দায় এড়াতে পারছে না। বর্তমানে একটি হাত হারিয়ে রসুল কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, যার ফলে তার পরিবারের আয়ের পথ চিরতরে রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মতে, কেবল আইনি সহায়তা নয়, একজন শ্রমিকের সারাজীবনের পঙ্গুত্বের দায়ভার কারখানা কর্তৃপক্ষকে আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই বহন করতে হবে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ বা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা না আসায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে। প্রশাসনিক নজরদারির অভাবকে দায়ী করে বক্তারা বলেন- মোংলা ইপিজেডের মতো একটি নিয়ন্ত্রিত শিল্পাঞ্চলে কীভাবে নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ মেশিনে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা সেফটি প্রোটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ইপিজেড প্রশাসনের ব্যর্থতা এখানে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। স্থানীয়দের দাবি, কারখানা কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে আসতে হবে এবং আহত শ্রমিকের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পঙ্গুত্বের ক্ষতিপূরণ বাবদ একটি যৌক্তিক অংকের আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। অন্যথায়, বৃহত্তর আন্দোলনের মাধ্যমে কারখানা কার্যক্রম স্থবির করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। এই দুর্ঘটনা কেবল একজন শ্রমিকের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং মোংলা ইপিজেডের সামগ্রিক কর্মপরিবেশের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। গোলাম রসুলের মতো একজন কর্মঠ শ্রমিকের পঙ্গুত্ব বরণ এবং পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের নির্বিকার ভূমিকা ভবিষ্যতে অন্য শ্রমিকদের কর্মনিরাপত্তার প্রতি এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয় এবং দুর্ঘটনায় দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করা না যায়, তবে ইপিজেডের উৎপাদন ব্যবস্থা ও শ্রমিকদের আস্থা উভয়ই সংকটের মুখে পড়বে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে এই দুর্ঘটনার নেপথ্যে থাকা কারিগরি ও প্রশাসনিক গাফিলতি চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি শ্রম খাতে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের প্রতি চরম অনাস্থা তৈরি করবে, যা শিল্পাঞ্চলটির দীর্ঘমেয়াদী ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।