আ: মালেক রেজা, শরণখোলা : রক্তের অটুট সম্পর্কের কাছে হার মেনেছে মরণব্যাধি লিভার সিরোসিস। মৃত্যুর প্রহর গোনা ছোট ইতিকে নিজের লিভারের একাংশ দান করে নতুন জীবন উপহার দিয়েছেন আখি। শনিবার (৪ জুলাই) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) দীর্ঘ ১৩ ঘন্টা জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই সফল লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের এই অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার দুই বোন আয়েশা সিদ্দিকা আঁখি ও ইসমত আরা ইতি। পারিবার সূত্রে জানা যায়, শরণখোলা উপজেলার খোন্তাকাটা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আলমগীর তালুকদারের ছোট মেয়ে খোলা সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইসমত আরা ইতি দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন।। অবর্ণনীয় কষ্টের মাঝে চিকিৎসকরা তাকে বাঁচাতে লিভার প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিলে, পরম মমতায় পাশে দাঁড়ান তার বড় বোন আয়েশা সিদ্দিকা আঁখি। নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী আঁখি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বেচ্ছায় ছোট বোনকে লিভারের একটি অংশ দান করার দুঃসাহসিক ও মহৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ?বিগত পাঁচ মাস ধরে হাসপাতাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর রক্তের সন্ধানে এক কঠিন লড়াই চালিয়েছে পরিবারটি। অস্ত্রোপচারের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন স্ট্যাটাসে আঁখি জানান, ছোটবেলায় বোনদের আক্ষেপ ঘোচাতে তিনি সবসময় বলতেন যে তিনিই তাদের ভাই এবং একজন ভাই বোনের জন্য যা করতে পারে, তিনি আজীবন তা-ই করবেন। নিজের লিভার দান প্রসঙ্গে আঁখি লেখেন, ছোট বোন সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে-এটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এটিকে কোনো ত্যাগ নয়, বরং নিজের দায়িত্ব ও ভালোবাসা হিসেবেই অবিহিত করেন তিনি। লিভার সিরোসিসের মতো এমন জটিল ও ব্যয়বহুল (২০ লাখ টাকা) চিকিৎসা সাধারণ একটি পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হলেও ইতির চিকিৎসায় স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। স্থানীয় সংবাদকর্মী, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও নেটিজেনরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো ক্যাম্পেইন চালিয়ে অর্থ সংগ্রহ করেন। দেশ-বিদেশের বহু হৃদয়বান মানুষের আর্থিক সহায়তা ও স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই এই অস্ত্রোপচারের পটভূমি তৈরি হয়। চূড়ান্ত অস্ত্রোপচারের আগে পিতা আলমগীর তালুকদার এক বোনের এই আত্মত্যাগ যেন অন্যজনের জীবনের আলো হয়ে ওঠে, সেই প্রার্থনা করেন সৃষ্টির স্রষ্টার কাছে এবং এবং দোয়া চাইলেন দেশবাসীর কাছে। দীর্ঘ ও জটিল এই অস্ত্রোপচার সফল হওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই বোনই বর্তমানে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। উৎকণ্ঠার প্রহর শেষে অপারেশন সফল হওয়ায় ইতির পরিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার ট্রান্সপ্লান্ট টিমের চিকিৎসক, নার্স ও সহায়তাকারী সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা ও রক্ত দিয়ে যারা পাশে ছিলেন, তাদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন পিতা আলমগীর তালুকদার। এক বোনের প্রতি আরেক বোনের এই অকৃত্রিম ত্যাগের গল্প এখন দেশজুড়ে প্রশংসায় ভাসছে; সবার একটাই প্রার্থনা—দ্রুত সুস্থ হয়ে আপন নীড়ে ফিরে আসুক এই দুই বোন।