নিজস্ব প্রতিবেদক: শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার, তখন যশোরের (ঈদগাহ) বাদশাহ ফয়সল ইসলামী ইনস্টিটিউটে চলছে ঠিক তার উল্টো চিত্র। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রকাশ্যেই চলছে নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের বাণিজ্য। সেই সাথে ভুলে ভরা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ, পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে গাইডনির্ভর পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক বদল করে ক্লাস করানো এবং পরীক্ষা পরিচালনায় চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের নেপথ্যে খোদ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন জড়িত রয়েছেন বলে দাবি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা ও স্কুলের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে বর্তমানে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। বাদশাহ ফয়সল ইসলামী ইনস্টিটিউটে চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে গুরুতর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কখনো অনুপম প্রকাশনীর মাধ্যমে অন্য স্কুল থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রশ্নে ইনস্টিটিউটের (আবা) লেখা দেখে বুঝা যাচ্ছে ধার করা প্রশ্নে পরীক্ষা চালাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। তবে যেভাবেই করা হোক না কেন, প্রতিটি প্রশ্নপত্রেই থাকছে অসংখ্য বানান ও বিষয়গত ভুল। এমনকি প্রশ্নপত্রে স্বনামধন্য এই প্রতিষ্ঠানের নামটি পর্যন্ত ভুল বানানে লেখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বেশ কয়েকটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক কোনো প্রশ্ন রাখা হয়নি। আবার অনেক ক্ষেত্রে এমন সব প্রশ্ন করা হয়েছে, যা নির্ধারিত সিলেবাসের সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে পরীক্ষা পরিচালনার নুন্যতম মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট প্রকাশনীর গাইড বই কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। এমনকি বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া সিলেবাসেও ওই নির্দিষ্ট গাইডের নাম উল্লেখ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আবার অন্য আরেকটি প্রকাশনীর সাথে অনৈতিক সমঝোতা করে নতুন গাইড কিনতে বাধ্য করা হয় শিক্ষার্থীদের। এর ফলে একই বিষয়ের দুটি করে গাইড কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের শিকারে পরিণত হয়েছেন শত শত সাধারণ অভিভাবক। অভিভাবকদের অভিযোগ, একেকটি গাইডের মূল্য প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। অথচ ইংরেজি ক্লাসে মূল পাঠ্যবই না পড়িয়ে কেবল গাইডের মডেল প্রশ্ন মুখস্থ করানো হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা থেকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক দিয়ে ক্লাস না করিয়ে খেয়ালখুশি মতো পাঠদান করানোর অভিযোগও বেশ পুরনো। এনটিআরসিএ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলা বিষয়ের একজন নিয়মিত শিক্ষককে বাংলা ক্লাস নিতে না দিয়ে ভূগোল ক্লাস করানো হচ্ছে। অন্যদিকে, খণ্ডকালীন (পার্ট-টাইম) শিক্ষক দিয়ে চালানো হচ্ছে বাংলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্লাস। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান দিন দিন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। একাধিক অভিভাবক আক্ষেপ করে জানান, এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে বা প্রশ্ন তুলতে সাহস পান না। প্রতিবাদ করলেই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। অভিযোগের তির মূলত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন এবং শিক্ষক মোস্তাক আহমেদসহ পরিচালনা পর্ষদের নির্দিষ্ট কয়েকজন শিক্ষকের দিকে, যারা একটি প্রকাশনী সংস্থার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এই গাইড বাণিজ্য চালাচ্ছেন। এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন প্রথমে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে একপর্যায়ে তিনি জানান, কয়েকজন অভিভাবক ও শিক্ষার্থী কিছু বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। পরীক্ষা পরিচালনার জন্য আমাদের একটি কমিটি রয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। প্রকাশনী সংস্থার কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগটি অস্বীকার করে তিনি জানান, কোনো কোম্পানির কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়নি। তবে তারা বিদ্যালয়ে কিছু চেয়ার-টেবিল দেওয়ার কথা বলেছিল। প্রশ্নপত্রে অসংখ্য ভুল থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজেরাই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপিয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করব।