শেখ কাজিম উদ্দিন, বেনাপোল : দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে বহুল আলোচিত ট্রাফিক পরিচালক মোঃ শামীম হোসেনকে অবশেষে বদলি করেছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাকে নাটোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) পদে পদায়ন করা হয়েছে। রোববার (২ আগস্ট) এ প্রজ্ঞাপণ প্রকাশের পরপরই বন্দরজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। দীর্ঘদিন ধরে শুল্ক ফাঁকি, ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য খালাস, ওজন স্কেলে কারসাজি ও প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে যেসব অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেই প্রেক্ষাপটে এ বদলিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বন্দর ব্যবহারকারী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ। একই সঙ্গে তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রেষণ-২ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপন (স্মারক নং-০৫.০০.০০০০.১৪০.১৯.০০০৩.২২.৪১৬, তারিখ ২ আগস্ট ২০২৬) অনুযায়ী, বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা মোঃ শামীম হোসেন (পরিচিতি নম্বর-১৬৩৯৯), যিনি বর্তমানে বেনাপোল স্থলবন্দরের ট্রাফিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাকে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে নাটোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) পদে বদলি করা হয়েছে। এর আগে তাকে ফরিদপুরে একই পদে পদায়নের আদেশ দেওয়া হলেও সর্বশেষ প্রজ্ঞাপণে তা সংশোধন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ নূর-এ-আলম প্রজ্ঞাপনটিতে স্বাক্ষর করেন। বদলির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বন্দরের ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তি ও কৌতূহল-দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দিনভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চলেছে সমালোচনা। একাধিক ব্যবসায়ী ও বন্দর-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অভিযোগ করেন, গত এক বছরে বেনাপোল বন্দরে যত ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য আটক এবং শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটেছে, তার অনেকগুলোর পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। তাদের দাবি, ওই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ট্রাফিক পরিচালকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, বন্দরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রেখে ওজন স্কেলে কারসাজি, ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য বিভিন্ন শেডে সংরক্ষণ এবং অবৈধভাবে পণ্য খালাসের সুযোগ তৈরি করা হতো। তাদের ভাষ্য, এসব অনিয়মের প্রভাব রাজস্ব আহরণেও পড়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে প্রায় ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। তবে ওই রাজস্ব ঘাটতির সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা সরকারি তদন্তে নিশ্চিত হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বড় ধরনের ঘোষণা বহির্ভূত চালান আটক হলে প্রকৃত দায়ীদের পরিবর্তে নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা দেখা যেত। তাদের ভাষায়, এতে মূল হোতারা আড়ালেই থেকে যেতেন। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। বন্দর ব্যবহারকারী ও সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনিক বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও বেনাপোল বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা শুল্ক ফাঁকি, ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য খালাস, রাজস্ব ক্ষতি ও অনিয়মের অভিযোগগুলো এখন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা। এ বিষয়ে সদ্য বদলির প্রজ্ঞাপণপ্রাপ্ত ট্রাফিক পরিচালক মোঃ শামীম হোসেন বলেন, “আমি ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে বেনাপোল স্থলবন্দরে যোগদান করি। দীর্ঘ দেড় বছরের দায়িত্ব পালনকালে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছি। যাদের অবৈধ সুবিধা দিতে পারিনি, তারাই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবেন, এটাই স্বাভাবিক। সরকারি রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। নাটোরে উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) হিসেবে আমার বদলি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় হওয়ায় এতে আমি সন্তুষ্ট।” আদেশ পেলে দ্রুত সেখানে যোগদান করব।