বিল্লাল হোসেন : তফসিল ঘোষণা হয়নি, ভোটের তারিখও ঠিক হয়নি। অথচ যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ধলগ্রাম ইউনিয়নে শুরু হয়েছে নির্বাচনী তোড়জোড়। সম্ভাব্য ৬ চেয়ারম্যান প্রার্থীকে ঘিরে জমে উঠেছে আলোচনা। প্রার্থী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে শুরু করেছে ভোটের হিসাব-নিকাশও। কেউ গণসংযোগ করছেন, কেউ ব্যানার-পোস্টার দিয়ে জানান দিচ্ছেন নিজের অবস্থান। সব মিলিয়ে তফসিলের আগেই ধলগ্রামে জমে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চেয়ারম্যান পদে অন্তত ছয়জনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে বিএনপির চারজন, জামায়াতে ইসলামীর একজন এবং তরুণ প্রজন্মের একজন রয়েছেন। তরুণ প্রার্থী বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও দলীয় সমর্থন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে। ফলে বিএনপির প্রার্থী বাছাই, দলীয় গ্রুপিং এবং তরুণ প্রার্থীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর ধলগ্রামের নির্বাচনী সমীকরণ অনেকটাই নির্ভর করছে। আলোচনার শুরুতেই রয়েছেন ধলগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলহাজ খয়বার রহমান মোল্লা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মামলা, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে স্থানীয় বিএনপি সূত্রে জানা গেছে। তার ছেলে যুবদল নেতা বুলবুলও রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখে পড়েছেন বলে দলীয় নেতাকর্মীদের দাবি। স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ মনে করে, দলের দুর্দিনের এই জ্যেষ্ঠ নেতাকে এবার চেয়ারম্যান পদে সুযোগ দেয়া উচিত। খয়বার রহমান মোল্লা বলেন, দল সমর্থন দিলে ধলগ্রামকে জনবান্ধব ও আধুনিক ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করবেন। মাঠে সক্রিয় রয়েছেন ধলগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুর্শিদুজ্জামান মনজু। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই নেতা দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। স্থানীয় রাজনীতির গ্রুপিংয়ে তার অবস্থান কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরব থাকার কারণে তার একটি গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় রয়েছেন স্থানীয় শিক্ষক মো. হুমায়ুন কবিরও। স্থানীয়দের একটি অংশের মতে, জ্যেষ্ঠদের মধ্যে তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বিএনপির একটি অংশ তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে শিক্ষকতার চাকরি রেখে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। আরেক আলোচিত নাম অধ্যাপক নাজমুল হাসান। তিনি বীর প্রতীক ইসহাক কলেজের অধ্যাপক এবং ধলগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। দলের কঠিন সময়েও তিনি মাঠে সক্রিয় ছিলেন। বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চায়। তবে শিক্ষকতা পেশার কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা তার প্রার্থিতার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই কারণে হুমায়ুন কবিরের প্রার্থিতাও অনিশ্চিত। নাজমুল হাসান বলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাবেন। দল ও সরকারের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেটি মেনে নেবেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে জনগণের জন্য কাজ করতে চান তিনি। ধলগ্রামের নির্বাচনী মাঠে আলোচিত আরেক নাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থিত মো. কামরুজ্জামান ওরফে মিঠু মোল্লা। দলীয়ভাবে আগেই তাঁর নাম চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে ইউনিয়ন জামায়াতের নেতৃত্বের একটি অংশ অন্য প্রার্থীকে প্রত্যাশা করেছিল বলে কয়েকজন নেতাকর্মী জানিয়েছেন। এতে দলের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলেও জানা গেছে। মিঠু মোল্লার সমর্থকদের দাবি, ব্যক্তিগতভাবে তিনি সৎ ও ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। তবে তাঁর বংশের কয়েকজনের আচরণ ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে এলাকায় সমালোচনা রয়েছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, বংশীয় প্রভাবকে কেন্দ্র করে কয়েকজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করা হয়েছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে মিঠু মোল্লার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে নতুন মুখ হিসেবে নির্বাচনী মাঠে আলোচনায় এসেছেন তরুণ প্রার্থী মেহেদী হাসান খাজা, যিনি খাজা মেহেদী শিকদার নামেও পরিচিত। স্থানীয়দের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হওয়া, গণসংযোগ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন বলে তার সমর্থকদের দাবি। নম্র ব্যবহার, উচ্চশিক্ষা ও তরুণ নেতৃত্বের কারণে যুব সমাজের একটি অংশ তার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে বলেও স্থানীয়দের ভাষ্য। খাজা মেহেদী বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তবে দলীয় সমর্থন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়দের একটি অংশের ধারণা, তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের সমর্থন তার অবস্থানকে শক্ত করতে পারে। খাজা মেহেদী পেশায় সাংবাদিক। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। অতীতে ছাত্রদলের বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্বেও ছিলেন। জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলি ও হামলার শিকার হওয়ার দাবিও করেছেন তিনি। তার দাবি, বিএনপির দুর্দিনে দলের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। ধলগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যশোর-৪ আসনের বিএনপির রাজনীতিতে একাধিক গ্রুপ সক্রিয়। এর প্রভাব ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও পড়তে পারে। বিএনপির একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলে দলীয় ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতের প্রার্থী মিঠু মোল্লা ও তরুণ প্রার্থী খাজা মেহেদীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী একজন প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হলে নির্বাচনের হিসাব পাল্টে যেতে পারে। স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছে, বিএনপির ভোট এক জায়গায় থাকলে দলটির প্রার্থীই এগিয়ে থাকতে পারেন। তরুণ প্রার্থী খাজা মেহেদী শিকদার বলেন, তিনি যুব সমাজের প্রতিনিধিত্ব করতে চান। মাদক থেকে তরুণদের দূরে রাখা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং ইউনিয়ন পরিষদে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই তার প্রধান লক্ষ্য। নারী, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের সরকারি সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে চান তিনি। নির্বাচিত হলে ধলগ্রাম ইউনিয়নকে জনবান্ধব, জবাবদিহিমূলক ও উন্নয়নের মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চান। তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় ধলগ্রামে ভোটের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপির সমর্থন শেষ পর্যন্ত কে পাচ্ছেন, শিক্ষক প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন কি না এবং খাজা মেহেদী স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন কি না-এসব সিদ্ধান্তের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে ধলগ্রাম ইউনিয়নের নির্বাচনী সমীকরণ। ফলে তফসিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠের তৎপরতা জানান দিচ্ছে, এবার ধলগ্রামে চেয়ারম্যান পদে লড়াই হতে পারে বেশ জমজমাট।