বাবুল আক্তার, চৌগাছা : যশোরের চৌগাছা উপজেলায় ছয়টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের কার্যক্রম কাগজে-কলমে সচল দেখিয়ে এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয়েছে। তবে সরেজমিন তদন্তে এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই অস্তিত্ব বা নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমের সত্যতা পাওয়া যায়নি। দু’একটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো থাকলেও সেখানে নেই প্রত্যাশিত শিক্ষার্থী ও নিয়মিত পাঠদান। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পরিচালিত সাম্প্রতিক তদন্তে এমন চিত্র উঠে এসেছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘কাজির গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ অনেকটা সে রকমই পরিস্থিতি। অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত রান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি নামের একটি বেসরকারি এনজিওর মাধ্যমে চৌগাছায় ছয়টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মধ্যে একটি এনডিডি (স্নায়ু ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী) এবং পাঁচটি নন-এনডিডি শ্রেণির বিদ্যালয়। সংশ্লিষ্ট এনজিওর মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে ১৫ থেকে ২৮ জন পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। এনজিওটির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০১৯ সালে বিদ্যালয়গুলো সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের পাশাপোল বাজারসংলগ্ন এলাকায় ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় শহীদ মতিউর রহমান অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী স্কুল। বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষকসহ ২৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনেও আবেদন করা হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের নামে আওয়ামী লীগ নেতা অবাইদুল ইসলাম সবুজ ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। তবে টাকা নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন অবাইদুল ইসলাম সবুজ। স্বরূপদাহ ইউনিয়নের খড়িঞ্চা বাজারের পশ্চিম পাশে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় নাসির উদ্দীন অটিস্টিক স্কুল। বিদ্যালয়টিতে ২২ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়োগের সময় শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে বিদ্যালয়টির নিয়মিত কার্যক্রম নেই। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মাসুদুর রহমান বলেন, ‘আপাতত স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।’ অর্থ বাণিজ্যের বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি। সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় নগরবর্ণি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়। সরেজমিনে গিয়ে সেখানে বর্তমানে বিদ্যালয়টির কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রধান শিক্ষক আওয়ামীলীগ নেতা আরিফুজ্জামান সাগর বলেন, ‘আপাতত স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীরা সবাই অন্য পেশায় যোগ দিয়েছেন।’ টাকা লেনদেন হয়ে থাকলে সভাপতি ও নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাই ভালো বলতে পারবেন। হাকিমপুর ইউনিয়নের স্বরূপপুরে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় স্বরূপপুর অটিস্টিক প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির অবকাঠামো থাকলেও সেখানে প্রত্যাশিত সংখ্যক শিক্ষার্থী নেই বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটিতে ১২ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মহিদুল ইসলাম জানান, স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলামের মাধ্যমে ডোনেশন নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ধূলিয়ানী ইউনিয়নের কুষ্টিয়া-রামভাদ্রপুর এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী (এনডিডি) স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জুল হোসেনের অভিযোগ, প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নামে আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি অংশ নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন করেছে। তার দাবি, এভাবে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হলেও বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চৌগাছা পৌর শহরের ইছাপুর মাঠপাড়া এলাকায় ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটিতে ২৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ পেয়েছেন। প্রধান শিক্ষক তুহিন উদ্দীন বলেন, ২০২২ সালে এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয়েছিল। তবে নানা কারণে বর্তমানে এমপিও-সংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তাঁর দাবি, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা বিদ্যালয়টি চালু রেখেছেন। এ বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম বজলুর রশিদ বলেন, এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করা ছয়টি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম যাচাই করতে সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে সরেজমিন তদন্ত করা হয়। তিনি বলেন, ‘তদন্তে গিয়ে অধিকাংশ বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব বা কার্যক্রমের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।’ চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, তদন্তের ভিত্তিতে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এসব বিদ্যালয়কে ঘিরে যদি অনিয়ম বা অর্থ বাণিজ্যের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত অর্থে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথ সহায়তার আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।