রাজয় রাব্বি, অভয়নগর (যশোর) : রাস্তার ওপর পলিথিন দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি টংঘর। একপাশে বাঁধা গরু-ছাগল, অন্যপাশে রাখা একটি চৌকি। পরিবারের সবার দিন-রাত কাটছে ওই একটিমাত্র চৌকিতেই। পাশে খোলা আকাশের নিচে মাটির চুলায় চলছে রান্নার আয়োজন। আর ঘরবাড়ির চারপাশজুড়ে থইথই করছে পানি। এভাবেই প্রায় তিন মাস ধরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন যশোরের অভয়নগর উপজেলার ভবদহ অঞ্চলের মানুষ। সরেজমিনে ভবদহ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জলাবদ্ধতার কারণে ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামের কয়েকটি পরিবার বাধ্য হয়ে রাস্তা ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি নিয়েই সেখানেই দিন কাটছে তাদের। পানির কারণে অনেক পরিবারের রান্নাবান্না ও খাবারের ব্যবস্থাও সীমিত হয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় নৌকাই এখন এ অঞ্চলের মানুষের চলাচলের অন্যতম ভরসা। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাকিস্তান আমলে ভবদহের ভবানীপুর এলাকায় শ্রী নদীর ওপর ২১ ভেন্ট, ৯ ভেন্ট ও ৬ ভেন্টের স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। সময়ের ব্যবধানে ওই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাই এখন এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকল্পের কাজ চললেও তারা কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না। বর্ষা এলেই পানিবন্দি হয়ে পড়তে হচ্ছে তাদের। এ ছাড়া, আমডাঙ্গা খাল সংস্কারে প্রায় ৪৯ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে পৃথক একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে এবং ঠিকাদারও নিয়োগ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের দুই বছর অতিবাহিত হলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি বলে জানা গেছে। উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামের বাসিন্দা শিবপদ বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা হচ্ছি জলজ প্রাণী, সাপ-ব্যাঙের সঙ্গে আমাদের বসবাস। সরকার ও আমলারা মিলে আমাদের জলজ প্রাণী বানিয়ে রাখছে। আমরা এ জলজ প্রাণীর মতো হয়ে বাঁচতে চাই না। ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। এমনকি সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালীও দীর্ঘ আন্দোলনের পর মারা গেছেন। তবে ভবদহের স্থায়ী সমাধান দেখে যেতে পারেননি তিনি। দ্রুত কার্যকর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করা হলে আবারও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। এ বিষয়ে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, প্রকল্পের ৭৩ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। যেসব স্থানে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, সেসব স্থানেই কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। নদী খননের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে আগামী ৫ থেকে ৭ বছর জলাবদ্ধতা থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।