আবদুল কাদের : চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল। দুপুর থেকে যশোরে শুরু হয় কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টি। এমন সময়ে চৌগাছার আন্দুলিয়া মাঠে কাজ করছিলেন আবু তাহের (৪৫) নামে এক কৃষক। বজ্রপাতে এসময় মারা যান তাহের। বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা সন্ধ্যা মাঠে খুঁজতে গিয়ে দেখেন ধানক্ষেতে তার পোড়া মরদেহ। একই সময়ে মনিরামপুর উপজেলার শাহাপুর গ্রামে বাড়ি থেকে মাঠে যাচ্ছিলেন কৃষক লুৎফর রহমান সরদার। তিনিও বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। সবশেষ ২২ সেপ্টেম্বর যশোরের কেশবপুর উপজেলার নতুন মূলগ্রামের বিলে মাছ ধরছিলেন জনাব আলী (৬৫)। হঠাৎ মেঘাচ্ছন্ন আকাশে শুরু হয় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। এমন সময়ে বজ্রপাতের আঘাতে ঘটনাস্থলে অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, এই তিন কৃষক নয়, গত এক বছরে যশোরে বজ্রপাতে মারা গেছে ৫১ জন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৮ জনই কৃষক। বাকীরা গৃহিনী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও চাকুরিজীবী। মৃতদের বয়স ১২ বছর থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তাদের অধিকাংশই ফসলের ক্ষেত, বাড়ি, খেলার মাঠ, জলাশয়ে বজ্রপাতে আক্রান্ত হয়েছে। এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যেই বজ্রপাতে হতাহত হন তারা। আর আহত হয়ে জীবন যাপন করছেন অন্তত ১৫ জন। হতাহতের মধ্যে সিংহভাগই গ্রামের বাসিন্দা। অথচ বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে ২০২২ সালে যশোরের ঝিকরগাছা ও কেশবপুরে তিনটি বজ্রনিরোধক দণ্ড (লাইটনিং অ্যারেস্টার) স্থাপন করা হয়েছিল। এতে সরকারের সাড়ে ২২ লাখ টাকার ওপরে ব্যয় হয়। এসব দণ্ড কোথায় কীভাবে আছে, কেউ খোঁজ রাখেন না। এরও আগে ২০১৮ সালের দিকে সরকারি উদ্যোগে আট উপজেলাতে তালগাছ লাগানো হয়েছিল। এখন সেসব গাছের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। বজ্রপাত থেকে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জীবন বাঁচাতে সরকারের পক্ষ থেকে দায়সারা প্রকল্প নিলেও কোনো প্রকল্পই সফলতার মুখ দেখেনি। ফলে জেলায় প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে বজ্রপাতে প্রাণহানির তালিকা।
# বজ্রনিরোধক দণ্ডের খোঁজ রাখেনি কেউ
যশোরের বজ্রপাত প্রবণ এলাকা যশোরের কেশবপুর ও ঝিকরগাছা উপজেলায় ২০২২ সালে তিনটি বজ্রনিরোধক দণ্ড (লাইটনিং অ্যারেস্টার) স্থাপন করা হয়েছিল। এতে সরকারের ব্যয় হয় ২২ লক্ষাধিক টাকার ওপরে। কেশবপুরের মজিদপুর ইউনিয়নের দেউলি গ্রামের বালিয়ার বিলে বসানো হয় একটি। অন্য দুটি ঝিকরগাছার মাগুরা ও গদখালিতে। কিন্তু এগুলো স্থাপনের পর আর কেউ খোঁজ নেয়নি। এখন যন্ত্রগুলো সচল আছে কি না, কেউ জানে না। সংশ্লিষ্ঠদের ভাষ্যমতে, বজ্রনিরোধক দণ্ডের চারপাশের নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গায় বজ্রপাতের ফলে সৃষ্ট উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎকে সহজে মাটিতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়। এতে ওই স্থানে কোনো প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেশবপুরের দেউলি গ্রামের বালিয়ার বিলে সারাবছরই জলাবদ্ধ থাকে। সেই বিলের ভিতরে বসানো হয়েছে বজ্রনিরোধক দণ্ড। নিচের বিভিন্ন ঢাকনা চুরি হয়ে গেছে। বুকসমান পানি মাড়িয়ে যেতে হয় দন্ডের স্থপনার কাছে। স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দণ্ড বসানোর দুই বছর এলাকায় বজ্রপাত কম দেখা দিতো। এখন আবার আগের মতো বজ্রপাত হয়। কিছুদিন আগেও এলাকায় একজন মারা গেছে। দায়িত্বরত কর্মকর্তারা খোঁজ নেয় না বলেও জানান তিনি। ঝিকরগাছার মাগুরা ও গদখালি ইউনিয়নে দুটি বজ্রনিরোধক দণ্ড খাতাকলমে বসানো থাকলেও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করে এটির হদিস পাওয়া যায়নি। মাগুরা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সাকিবুল ইসলাম চাকলাদার জানান, ‘আমার জানামতে ইউনিয়নে বসানো হয়নি। একই কথা জানান গদখালি ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম। তিনি জানান, বর্ষা মৌসুমি অনেক ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করে পাঁচ হাজার ফুল চাষি। অনেক সময় দাবি জানালেও দন্ড বসানো হয়নি।’
# তালগাছের অস্তিত্ব নেই
২০১৮ ও ২০২২ সালে সরকারিভাবে পাঁচ হাজার তালগাছ রোপণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন এসব তালগাছের কোনো অস্তিত্ব নেই। এগুলো রোপণের পর আর কোনো পরিচর্যা করা হয়নি। ফলে এ প্রকল্পের কোনো ফল হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২২ সালে কেশবপুর উপজেলার বালিয়ার বিলের সড়কের ধার দিয়ে ৫০টির বেশি তাল গাছের চারা রোপন করা হয়েছিলো। সেইগুলো একটি বেঁচে নেয় বলে জানান স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী। এছাড়া কেশবপুরে কপোতাক্ষ নদের পাড়ে তাল গাছের চারা রোপন তথ্য থাকলেও তার অস্তত্ব পাওয়া যায়নি। কতটাকা ব্যয়ে এসব চারা রোপন করা হয়েছিলো সেটি বলতে পারেনি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ। তিনি জানান, ‘৫ আগস্ট গণঅভ্যুস্থানের দিন অগ্নিকান্ডে তার কার্যালয় পুড়ে যায়। সেই সাথে পুড়ে যায় সব নথিপত্র।
# ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা জানেই না মানুষ
চলতি বছর মনিরামপুর উপজেলার ডুমুরির বিলের একটি ঘেরে কাজ করার সময়ে বজ্রপাতে মারা যান হাফিজুর রহমান (৫০)। বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির পরিবার সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা ও আহত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার সরকারি অনুদান পাওয়ার কথা। তবে হাফিজুরের স্ত্রী তহমিনা জানান, তারা এ ধরনের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে জানেন না। এ জন্য আবেদন করেননি। এভাবে বজ্রপাতে নিহত ও আহতদের পরিবার ক্ষতিপূরণের বাইরে থেকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো প্রচার-প্রচারণা না থাকায় এবং আবেদন প্রক্রিয়া জটিল থাকায় ক্ষতি পূরণের বাইরে থেকে যাচ্ছে এসব ক্ষতিগ্রস্তরা। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মকর্তা বলছে, আবেদন করলে ক্ষতিগ্রস্তদের অনুদান দেওয়া হয়। তবে আবেদনকারী বজ্রপাতের চেয়ে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্তরাই বেশি হয়ে থাকে।
ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আবদুল কাদের বলেন, ‘জেলায় অনেক আগে তিনটি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো হলেও সেগুলো কেমন কিভাবে আছে জানা নেই। আর তালগাছের চারা রোপন করা হলেও সেগুলোও অস্থিত্ব নেই। কেননা স্থানীয়রা মেরে ফেলে কিংবা গরু ছাগলে খেয়ে ফেলে। আমরা এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে মূলত প্রচারনা ও সচেতনা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছি।’ বিশেষজ্ঞরা কি বলছেন, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঘটনা এবং এর তীব্রতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর পেছনে জলবায়ুর পরিবর্তন, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, অনিয়মিত আবহাওয়া এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে। উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু দ্রুত উপরে উঠে শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরি করে। মেঘে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জের পার্থক্য বাড়লে বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে মার্চ থেকে মে মাসে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রতি বছর শত শত মানুষের প্রাণহানি হয় ও কৃষিজীবী মানুষের ঝুঁকি বাড়ে এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব মিলিয়ে বজ্রপাত দেশের অন্যতম দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, বাংলাদেশে বজ্রপাত বাড়ার একাধিক কারণ রয়েছে। যেমন জলবায়ুর পরিবর্তন, আর্দ্রতা বাড়ায় দীর্ঘ তাপপ্রবাহ এবং বড় গাছ কমে যাওয়া। ভূপৃষ্ঠের গরম বাতাস দ্রুত উপরে উঠে যায় এবং শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরি করে। এই মেঘ থেকেই বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বজ্রপাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আরেকটি কারণ হলো দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ। অতিরিক্ত গরমে নদী-খাল ও জলাশয় থেকে বেশি জলীয়বাষ্প সৃষ্টি হয়, যা বজ্রমেঘকে আরও শক্তিশালী করে। এতে বজ্রপাত হয়। আমাদের বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ছে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস এবং স্থানীয় জলীয়বাষ্প মিলে বায়ুমণ্ডলে প্রচুর শক্তি সঞ্চিত হয়। এতে বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের তীব্রতা বাড়ে।