নিজস্ব প্রতিবেদক: যুক্তি আর পাল্টা যুক্তিতে জমে উঠেছিল খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ের ফাইনাল পর্বের বিতর্ক। দর্শকদের হাততালি আর বিতার্কিকদের যুক্তি প্রয়োগ ও খণ্ডনের মধ্য দিয়ে চলছিল বিতর্ক। শেষে বিচারকের মার্কসে খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় সেরা হয়েছে যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। আর রানার্সআপ হয়েছে মাগুরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রতিযোগিতায় সেরা বক্তা হয়েছেন রানারআপ দলনেতা আদ্র দে। দলটির অপর দুই বিতার্কিক হলেন সৈয়দ মাহদী হুসাইন ও শাদমান শাকিব খান। চ্যাম্পিয়ন দলের বিতার্কিকরা হলেন ইফফাত জামান রায়া, অয়ন্তিকা দে দেবলীনা ও তানিশা ইসলকাম রুপন্তি। বৃহস্পতিবার প্রেসক্লাব যশোর মিলনায়তনে খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ের এই বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আয়োজন করে বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (বিএফএফ) ও সমকাল। পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। ‘বিতর্ক মানেই যুক্তি, বিজ্ঞানে মুক্তি’ এই প্রতিপাদ্যে নিয়ে বির্তক উৎসবের শুরু হয় সকাল ৯টায়। তবে খুব সকাল থেকেই খুলনা বিভাগের ৯ জেলার সেরা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহীনকারী শিক্ষার্থীরা বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে উপস্থিত হন প্রেসক্লাব প্রাঙ্গনে। তাদের সঙ্গে ছিলেন স্কুল শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। বির্তক শুরুর আগে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করতে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন নানা প্রস্তুতি। নিয়ম মেনে বিতর্ক প্রতিযোগিতা শুরু হলো সকাল ৯টায়। বিতার্কিকদের নির্ধারিত বিষয়ের ওপর পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য-যুক্তি উপস্থাপন ও যুক্তি খণ্ডনের মধ্য দিয়ে জমে ওঠে বির্তক উৎসব। প্রায় ৭ ঘন্টাব্যাপী এই বির্তকে যুদ্ধে সবাই সবাইকে করেছেন নাস্তানাবুদ। কেননা অংশ নেওয়া ৯ দলই জেলা পর্যায়ের চ্যাম্পিয়ন দল। তাই তো প্রতিটি পর্বেই অংশগ্রহনকারী দলগুলোদের মার্কস দিতেও বিচারকের হতে হয়েছে হিমশিম! বিচারকদের এক মার্কস বেশি পেয়ে বিভাগীয় পর্যায়ের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যশোরের সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। রানার্সআপ হয়েছে মাগুরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। অংশগ্রহণকারী বাকি দলগুলি হলো, খুলনা পাবলিক স্কুল এণ্ড কলেজ, সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ঝাউদিয়া বাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চুয়াডাঙ্গা ভিক্টোরিয়া জুবিলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মেহেরপুরের গাংনী জোড়পুকুরিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নড়াইলের লক্ষ্মীপাশা আদর্শ বিদ্যালয় ও বাগেরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। দিনব্যাপী প্রতিযোগিতা শেষে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেন যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন। বিশেষ অতিথি ছিলেন যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক খান মাসুম বিল্লাহ, দৈনিক সমকাল অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক মনিরুল ইসলাম, যশোর মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আলাউদ্দিন আল মামুন। মানবাধিকারকর্মী ও ব্ল্যাস্ট যশোরের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোস্তফা হুমায়ুন কবীরের সভপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিতর্ক উৎসবে বিচারকের দায়িত্ব পালনকারী সিনিয়র সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম সজল, শিশুসাহিত্যিক হাবিবুর রহমান মিলন, বিসিএমসি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের রেজিস্ট্রার হাবিবুর রহমান রিপন, মাইকেল মধুসূদন ডিবেট ফেডারেশনের চেয়ারম্যান বায়জিত মাহমুদ অভি, তাসনিমুল আলম এবং সুহৃদ সমাবেশের সাধারণ সম্পাদক সুকান্ত দাস। প্রধান অতিথির বক্তব্যে যশোরের জেলা পরিষদ প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু-কিশোরদের মাদক ও অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়, যা উদ্বেগজনক। তবে কোনো শিক্ষার্থী যদি বিতর্ক চর্চার মধ্যে থাকে, তাহলে সে কখনও মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত হতে পারে না। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বই পড়া ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকলে তার মধ্যে দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে ওঠে। ফলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ কমে। তিনি এই ধরণের আয়োজনের জন্য সমকাল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বিতর্ক প্রতিযোগিতা করতে হলে জ্ঞান জগতের নানা শাখায় বিচরণ করতে হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের নানামুখি প্রতিভার জানালাগুলো খুলতে থাকে। এর ফল হিসেবে নানামুখি দক্ষতারও উন্মেষ ঘটে। আর এসব শিক্ষার্থীরা তাদের শ্রেণি কার্যক্রমেও ভালো করে। তিনি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিটি দলকে অভিনন্দন জানান। আর আগামীতেও এই চর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। বিশেষ অতিথি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক খান মাসুম বিল্লাহ বলেন, আজকের তথ্য প্রযুক্তির যুগে যেমন বিতর্কে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে, তেমনি বিতর্কের সৌন্দর্যও অনেক বেড়েছে। ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য নিজেদেরকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিতর্ক প্রতিযোগিতার একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পরীক্ষার খাতায় বিতর্কের কোনো নম্বর যোগ না হলেও জীবনের খাতায় এর নম্বর যোগ হবেই। সমকালের অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, সমকাল শুধু সংবাদ প্রকাশই করে না। সমকাল সমাজের অনেক সামাজিক কর্মকান্ডও পরিচালনা করে। গুণী মানুষের সম্মাননা দেয়। সমাজে যত ভালো কাজ; সেটার সঙ্গেই সমকাল যুক্ত রয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তিনির্ভর চর্চা ও মুক্তবুদ্ধির বিকাশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। বির্তক উৎসবে অংশ নেওয়া সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদুর রহমান বলেন, খুব ভোরে যশোরে এসেছি। এ ধরণের বড় বির্তক উৎসবে শুরুতে কিছুটা নার্ভাস থাকলেও প্রতিযোগিতাস্থলে এসে অন্যদের দেখে ভালো লেগেছে। অভিভাবকরাও ছিলেন উৎসাহিত। নুরনাহার নামে এক অভিভাবক বলেন, বিতর্কের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আলোকিত ও মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। সমকালের এ আয়োজন তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রসঙ্গত, গত ২৯ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টাইম মিডিয়া ভবনের সমকাল চত্বরে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর দেশজুড়ে জেলা পর্যায়ের বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। জেলা পর্যায়ের চ্যাম্পিয়ন দলগুলো বিভাগীয় উৎসবে অংশগ্রহণ করছে। এই প্রতিযোগিতায় ৬৪ জেলার ৫২০টি বিদ্যালয়ের অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির প্রায় দুই হাজার বিতার্কিক অংশ নিচ্ছে। তিন পর্বের বিতর্কে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা শেষে দেশসেরা ১৬টি দল অংশ নেবে জাতীয় পর্যায়ে চূড়ান্ত আসরে। চূড়ান্ত পর্বের বিতর্ক ও সমাপনী অনুষ্ঠানের প্রাথমিক তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৩ ও ১৪ নভেম্বর।