কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি : মহাকাশে মানুষের বসতি স্থাপনে তিনটি বিষয়ে গবেষণা করে প্রতিবেদন লিখেছেন ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ শিক্ষার্থী খাজা আতিফ আবিদ,তসলিম উদ্দিন, আরেফিন সিদ্দিকী, ওমর ফারুক আল সাবিত, তাওফিক আহমেদ, তাসলিম আহমেদ,মুনতাসির রহমান বিশ্বাস। যার মধ্যে রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা, সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার,টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিনন্দন ও বাস্তবভিত্তিক সমাধান। এই প্রকল্পটির বাস্তব ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা হলে, ভবিষ্যতে মহাকাশ অভিযানের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন ওই শিক্ষার্থীরা। যে প্রতিবেদনটি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান (এন,এস,এসের) লিভিং ইন এ হেলদি স্পেস প্রতিযোগিতায় বিশ্বের দশম গ্রেডে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। এ ফলাফলে তারা খুশি। তবে ওয়াশিংটনে যাবার ব্যয়ের কথা ভেবে চিন্তার ভাজ তাদের কপালে। কারন প্রতিযোগিতায় গিয়ে তাদের প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করতে না পারলে সব পরিশ্রম বিথা হবে ওই শিক্ষার্থীদের। এ জন্য তারা সরকার তথা সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করেছেন। এ খবরে সামনের দিনে এগিয়ে যেতে শিক্ষার্থীদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। কোটচাঁদপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ শিক্ষার্থীর একজন খাজা আতিফ আবিদ। ২০২৪ সালে তাঁর ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের বন্ধুরা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্পেস সোসাইটি (এন,এস,এসের) প্রতিযোগীতায় অংশ গ্রহন করেন। যার ফল ঘোষণা হয় ২০২৫ সালের মার্চ মাসে। আর সেই প্রেস রিলিজটি প্রকাশ করেছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ওই প্রেস রিলিজটি দেখে অনুপ্রেনীত হন আবিদ। এরপর থেকে ওই শিক্ষার্থী গবেষণার প্রতিবেদন লেখার কথা ভাবতে থাকেন। সে ভাবনা থেকে তাঁর বিদ্যালয়ের দশম শ্রেনীর ৬ বন্ধুকে নিয়ে একটা দল গঠন করেন। লেখা শুরু করেন ওই প্রতিবেদন। তাদের বিষয় ছিল “এ ভিশন অফ হারমোনি,হেলথ এন্ড প্রগেসেস। যেটি লিখতে তাদের এক বছর সময় লেগে ছিল । আর এ প্রতিবেদন লেখার বেশির ভাগ সময় তারা এক সঙ্গে কাটিয়েছেন বিদ্যালয়ের ল্যাবেই। ওই শিক্ষার্থীরা তাদের ক্লাসের পড়ার পাশাপাশি তারা এ কাজটি করতেন। এরপর সেই গবেষণার প্রতিবেদনটি ২১ নভেম্বর ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের (এনএসএসের)লিভিং ইন এ হেলদি স্পেস প্রতিযোগিতায় পাঠিয়ে দেন। যার ফল প্রকাশিত হয় ৩১ শে জানুয়ারি ২০২৬ সালে (এনএসসের) ওয়েবসাইট । সেই ওয়েবসাইট থেকে তারা জানতে পারেন দশম গ্রেডে (বড় দল) ক্যাটাগরিতে তাদের দল প্রথম হয়েছেন। এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ২৫২ টি দেশ অংশ গ্রহন করেন বলে জানিয়েছেন তারা। এ প্রকল্প কিভাবে কাজ করবে জানতে চাইলে,আবিদ বলেন,“স্টেলার হ্যাভেন” একটি গবেষণাভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী চন্দ্র বসতি পরিকল্পনা। যার মূল লক্ষ্য চাঁদের কঠিন ও প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি, নিরাপদ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ মানব সমাজ গড়ে তোলা। এই প্রকল্পে প্রথমে ৭০ হাজার মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার পর্যন্ত উন্নীত করা সম্ভব হবে। আমরা পুরো স্থাপনাটি দুটি বৃহৎ ষড়ভুজ কাঠামো এবং একটি কেন্দ্রীয় টাওয়ার নিয়ে নির্মিত দেখিয়েছি। এই কেন্দ্রীয় অংশ শক্তি সরবরাহ, বায়ু নিয়ন্ত্রণ, পানি বণ্টন এবং তথ্য আদান-প্রদানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। যার নকশাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ছোট সংযোগকারী পডের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন অংশ যুক্ত করা যায়। এর ফলে পরে কাঠামো পরিবর্তন না করেই বসতিকে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। প্রকল্প অনুযায়ী প্রথম দুই বছরে ভিত্তি নির্মাণ ও মূল অবকাঠামো স্থাপন করা হবে। পরবর্তী কয়েক বছরে আবাসন, কৃষি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা উন্নয়ন করা হবে। যা দশ বছরে সম্পূর্ণ প্রস্তুত একটি চন্দ্র সমাজ গড়ে উঠবে। এখানে টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরবচ্ছিন্ন শক্তি। যেহেতু চাঁদের দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য পৃথিবীর তুলনায় ভিন্ন এবং চন্দ্ররাত প্রায় ১৪ দিন স্থায়ী হয়। সেহেতু দিনের বেলায় সৌরশক্তি ব্যবহার করা হবে। কারণ চাঁদের পৃষ্ঠে সূর্যালোক সরাসরি পৌঁছায়। তবে দীর্ঘ রাত্রিকালে শক্তি সরবরাহের জন্য ৪০ কিলোওয়াট ফিশন সারফেস পাওয়ার সিস্টেম ব্যবহার করা হবে। যা পারমাণবিক শক্তির মাধ্যমে ধারাবাহিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। যা উন্নত শক্তি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ বণ্টন করবে। যাতে কৃষি, পানি পুনর্ব্যবহার, বায়ু নিয়ন্ত্রণ ও আবাসিক অংশ সব সময় সচল থাকে। খাদ্য নিরাপত্তা এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এজন্য মোট এলাকার প্রায় ৩৮ শতাংশ কৃষির জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে।যেহেতু চাঁদের মাটিতে সরাসরি চাষ সম্ভব নয়। সে কারনে হাইড্রোপনিক্স ও অ্যারোপনিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।হাইড্রোপনিক্স মাটি ছাড়া পুষ্টিসমৃদ্ধ পানিতে গাছ জন্মায়। এ কারনে দ্রুত বৃদ্ধি ও পানি সাশ্রয় সম্ভব হয়। আর অ্যারোপনিক্সে গাছের শিকড়ে সূক্ষ্ম পুষ্টি কণার স্প্রে করা হয়। যা খুব অল্প পানি ব্যবহার করে বেশি ফলন দেয়। এই পদ্ধতিতে পালং শাক, লেটুস, টমেটো, স্ট্রবেরি, মটরশুঁটি, কুইনোয়া, ডাল ও বাদামজাতীয় ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে সাপ্তাহিক খাদ্যতালিকা এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। যাতে প্রতিদিন প্রয়োজনীয় ক্যালরি, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, চর্বি, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান নিশ্চিত হয়। যা কম মাধ্যাকর্ষণে হাড় ও পেশির দুর্বলতা রোধে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আবিদ আরো বলেন, চাঁদে উচ্চ বিকিরণ একটি বড় ঝুঁকি। পৃথিবীর মতো সেখানে চৌম্বক ক্ষেত্র বা ঘন বায়ুমণ্ডল নেই। ফলে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি সরাসরি পৃষ্ঠে পৌঁছায়। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ বিকিরণ প্রতিরোধী প্রাচীর, পানি স্তর, পলিথিন ও ধাতব আবরণ ব্যবহার করা হয়েছে । ভেতরে স্থাপন করা হবে সেন্সর, যা বিকিরণ মাত্রা পরিমাপ করবে এবং এআই-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা নিরাপদ সময় নির্ধারণ করবে। বাইরে কাজ করার সময় মহাকাশচারীরা বিশেষ সুরক্ষিত পোশাক পরবে। যাতে দিনে ও রাতে উন্নত লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমে তাপ, আর্দ্রতা ও বায়ুর মান।