Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

‘নার্সারির গ্রাম’ মণিরামপুরের বাসুদেবপুর, ৮০ ভাগ মানুষেরই নার্সারি ব্যবসা

এখন সময়: রবিবার, ২৮ জুন , ২০২৬, ০১:১৬:১৫ এম

আবদুল কাদের : যশোরের মণিরামপুরের রোহিতা ইউনিয়নের একটি গ্রাম বাসুদেবপুর। এই গ্রামের ৮০ ভাগ মানুষই নার্সারি ব্যবসার সাথে জড়িত। গ্রামে ছোট বড় মিলে প্রায় পাঁচ শতাধিক নার্সারি রয়েছে। এইসব নার্সারিতে প্রায় দেড় হাজার রকমের গাছের চারা তৈরি করে বিক্রি করেন তারা। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসে এখানকার চারা নিয়ে যান। আর নার্সারি ব্যবসা করেই গ্রামের মানুষ স্বাবলম্বী হয়েছেন। গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে ‘নার্সারি ভিলেজ’ হিসাবে। বর্ষা মৌসুমে ১৫ কোটি টাকার চারা বিক্রি হলেও সারা বছরের বিক্রির হিসেবে এই টাকার অংক আরো অনেক বেশি। যশোর সদর থেকে দক্ষিণে বাসুদেবপুরের দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার। গ্রামের পিচ ঢালা সড়ক ধরে এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে বাড়ি বাড়ি নার্সারি। কোথাও অনাবাদি নেই এক চিলতে জমি। রাস্তার পাশে যতদূর দৃষ্টি যায় ফুল, ফল, মশলা ও বনজের প্যাকেট চারা দেখা যায়। চলতি পথে নার্সারিগুলোয় ব্যস্ততার দৃশ্য চোখে পড়ে। নিড়ানি দিয়ে আগাছা বাছা ও ঝাঝরি দিয়ে চারায় পানি দেয়ায় ব্যস্ত সবাই। আবার কেউ ভ্যান, নসিমন, ট্রাক ও পিকআপে চারা তুলে দিচ্ছেন। নার্সারিগুলোতে নারী-পুরুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। বাড়ির সামনে পেছনে আশপাশে নার্সারি গড়ে তুলেছেন সবাই। সব বাড়ির সামনে নার্সারির নাম সম্বলিত সাইনবোর্ড। স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারার মধ্যে বাসুদেবপুরে লিচু চারার বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি। দিনাজপুরের চাষিদের কাছে বাসুদেবপুরের লিচু চারার কদর অনেক। এখানকার চাষিদের দাবি, সারা দেশের মধ্যে বাসুদেবপুরে সর্বোচ্চ পরিমাণ লিচুর চারা উৎপাদন হয়। মৌসুম চলাকালিন ৪০ থেকে ৫০ ট্রাকের ওপর লিচুর চারা বিক্রি হয়। # শুরুর গল্প হতে চলল প্রায় অর্ধশতাব্দী। দীর্ঘ এই সময় ধরে নার্সারির ব্যবসা চলছে বাসুদেবপুরে। তবে শুরুর দিকের গল্পটা একটু অন্যরকম। ঠিক নার্সারি ব্যবসার চিন্তা থেকে এটির গোড়াপত্তন হয়নি। আজকের এই শত শত নার্সারি পথিকৃৎরা ‘বাচড়ায়’ (স্থানীয় ভাষায় পতিত জমি) দেশি মশলাসহ বিভিন্ন ফলের চারার আবাদ গড়ে তোলেন। নিজেদেরসহ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই আবাদ থেকে বেশ কিছু মুনাফা হতো তাদের। উৎপাদিত চারা, কিংবা নামমাত্র টাকার বিনিময়ে মালিকদের কাছে থেকে পতিত জমি নিয়ে এগুলোর উৎপাদন করতেন তারা। পতিত জমির মালিকদের অনেকে বিনে পয়সায়ও তাদের জমিতে এসবের আবাদ করতে দিতেন। মশলার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির চারার মধ্যে বিশেষ করে লিচু চারার আবাদ হতো সবচেয়ে বেশি। আর এই লিচু চারার হাত ধরেই এখানে ফলদ, বনজসহ রকমারি বৃক্ষের চারার উৎপাদন শুরু হয়। # যার হাত ধরে শুরু হয় গোড়াপত্তন বাসুদেবপুরে নার্সারি ব্যবসার যাত্রা শুরু হয় মোহাম্মদ আলী নামে সাবেক মেম্বারের হাত ধরে। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে তিনি নার্সারির ব্যবসা শুরু করেন। তার ছেলেরা এখন সেই নার্সারি ব্যবসার হাল ধরেছেন। পারিবারিকভাবে তার ছেলেরা নার্সারি ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। তাদের এই নার্সারিটির নাম ‘পুরাতন নার্সারি’। ২২ বিঘার জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই নার্সারিটিতে কয়েকশ’ প্রজাতির লক্ষাধিক গাছের চারা রয়েছে। নার্সারির গোড়াপত্তনকারী মোহাম্মদ আলী সারাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ চারা উৎপাদনকারী চাষি হিসেবে একবার পুরস্কারও পেয়েছেন। মোহাম্মদ আলীর ছোট ছেলে আনোয়ারুল ইসলাম জানান, তাদের নার্সারিটির নাম ‘পুরাতন নার্সারি’। এলাকার প্রথম নার্সারি বলে এটিকে বেশির ভাগ মানুষ পুরাতন নার্সারি বলে চেনেন ও এই নামেই ডাকেন। আর তার থেকেই এটির নামও হয়ে গেছে পুরাতন নার্সারি। কাগজ কলমেও এটির নাম পুরাতন নার্সারি। তাদের এই নার্সারিটির বয়স প্রায় ৫৫ বছর। তিনি দাবি করেন, তাদেরটি খুলনা বিভাগের প্রথম নার্সারি। এমন একটা সময় ছিলো যখন খুলনাসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়িরা এসে তাদের এখান থেকে চারা সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। # বাসুদেরপুরের লিচুর চারা যায় দিনাজপুরে সারাদেশের মধ্যে সর্বাধিক লিচুর চারা উৎপাদন হয় বাসুদেবপুরে। দিনাজপুরের চাষিদের কাছে এখানকার লিচুর চারার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রত্যেক বর্ষায় দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায় বাসুদেবপুরের লিচুর চারা। একেক মৌসুমে ৩০ থেকে ৪০ হাজারেরও বেশি লিচুর চারা দিনাজপুরে যায়। সেখানকার চাষিরা এখান থেকে লিচুর চারা কিনে নিয়ে যান। বাসুদেবপুরের বিভিন্ন নার্সারি থেকে ৪০ থেকে ৫০ ট্রাক লিচুর চালান যায়। স্থানীয় নার্সারি মালিকদের দাবি, দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ লিচুর চারা উৎপাদন হয় বাসুদেবপুরে। বষা মৌসুমেই ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার লিচু চারা চারা বিক্রি হয়। এছাড়াও সারা বছর এখানে লিচুর চারা বিক্রি হয়। # চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা বাসুদেবপুর বাজারের শুরুতেই এনামুল হকের একতলা বাড়ি। বাড়ির সঙ্গেই তিনি প্রায় এক একর জমিতে নার্সারি গড়ে তুলেছেন। বাড়িতে বসেই নারকেল, সুপারির চারা বিক্রি করতে দেখা গেল তাকে। এনামুল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করেছিলেন। ঢাকায় ভালো বেতনে চাকরি করতেন। করোনা পরিস্থিতিতে চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে নার্সারির কাজ শুরু করেন। এনামুল বলেন, ‘নিজেই চারা উৎপাদন করি, আবার অন্যদের কাছ থেকেও সংগ্রহ করে খুচরা বিক্রি করছি। এতে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, চাকরি আর করব না।’ ৩৭ বছর আগে অন্যের জমিতে শ্রম দিতেন মোশাররফ গাজী। একসময় পাঁচ শতক জমি ইজারা নিয়ে চারা তৈরির উদ্যোগ নেন। চারা তৈরি ও বিক্রিতে ভালো লাভ দেখে পরের বছর এক বিঘা জমিতে চারা তৈরি করেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন নিজের ১৮ বিঘা জমিতে চারা তৈরি করছেন। চারার ব্যবসা করে তিনি বাসুদেবপুর বাজারে দোতলা মসজিদ ও মাদ্রাসা তৈরি করে দিয়েছেন। মসজিদের সামনে রাস্তার সঙ্গে চারা বিক্রির বিশাল একটি কেন্দ্র রয়েছে তার। সেখানে দেশি ফলের চারার পাশাপাশি বিদেশি পার্সিমন, ডরিয়ান, রামভুটান, পিনাক বাটার, কিউই, শ্বেত চন্দন, রক্ত চন্দন, আপেলসহ বিভিন্ন ধরনের ফলদ ও ভেষজ গাছের চারা পাওয়া যাচ্ছে। মোশাররফ গাজীর মতো এই গ্রামের আরও চারজন চারার ব্যবসা করে কোটিপতি হয়েছেন। তারা হলেন ভাই ভাই নার্সারির রুহুল আমিন, তরফদার নার্সারির রিয়াজ তরফদার, বিশ্বাস নার্সারির স্বপন কুমার বিশ্বাস ও বিসমিল্লাহ নার্সারির কুদরত আলী গাজী। বাসুদেবপুরের নার্সারি মালিক সমিতির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান জানান, সারা গ্রামে পাঁচশ’ বেশি নার্সারি রয়েছে। এছাড়াও প্রত্যেক বাড়ির উঠোনো চারা আবাদ করেন সবাই। ছোট নার্সারিগুলোতে স্বাভাবিকভাবে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার টাকার বিক্রি হয়। বড়গুলোর বিক্রির পরিামাণ আরো অনেকগুণ বেশি। প্রতিবছর চারা বিক্রি থেকে বাসুদেবপুরে ১৫ কোটি টাকার উপর আর্থিক লেনদেন হয়। তিনি বলেন, নার্সারি চারা উৎপাদন করে না এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া কঠিন বাসুদেবপুরে। মাহাবুবুর রহমান বলেন, বর্ষা মৌসুমে ৩৫ থেকে ৪০ ট্রাক লিচুর চারা যায় দিনাজপুরে। সারা দেশের মানুষ যে লিচু খায় সেই চারা বাসুদেবপুর থেকে যায়। দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ লিচুর চারা বাসুদেবপুরের নার্সারি থেকে উৎপাদন হয়।’

Ad for sale 100 x 870 Position (2)
Position (2)
Ad for sale 225 x 270 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 225 x 270 Position (4)
Position (4)