Ad for sale 100 x 870 Position (1)
Position (1)

❒ আজ ভবদহ দিবস

‘আমাগের এই দুক্কোডা কি দূর হবে না’

এখন সময়: রবিবার, ৪ অক্টোবর , ২০২৬, ১১:০১:০৮ পিএম
‘আমাগের এই দুক্কোডা কি দূর হবে না’

নিজস্ব প্রতিবেদক : সাজানো– গোছানো সংসার ছিলো ক্ষুদিরাম-চিত্রা বিশ্বাস দম্পতির। ঘরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে স্বপ্নের বসতভিটা ; সবই এখন পানির নিচে। নিজের ঘর ছেড়ে গৃহপালিত পশুদের সাথে নিয়ে এই সড়কের পাশেই আশ্রয় নিয়েছেন তারা। এক বা দুই দিন নয়, দীর্ঘ চারটা মাস ধরে এভাবেই কাটছে তাদের যাযাবর জীবন। যশোরের মণিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর গ্রামের এই দম্পত্তির টিনের ছাপরা ঘরে অমানবিক জীবনযাপনের মধ্যেই হঠাৎ নেমে আসে আরেক অন্ধকার। স্ট্রোকে আক্রান্ত গুরুতর অসুস্থ পড়েন ক্ষুদিরামের স্ত্রী চিত্রা বিশ্বাস। কিন্তু জলাবদ্ধতায় ফসল ডুবে অর্থসংকটে যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে চিকিৎসার খরচ আসবে কোথা থেকে? ৫৫ বছর বয়সী ক্ষুদিরাম জানান, ‘ঘরের মধ্যে এক হাত জল উঠেছিল। এখন কমে এক বিঘত দাঁড়িয়েছে। উঠানে কোমর সমান জল থাকলেও এখন হাঁটুজল। চার মাস ধরে রাস্তার ওপর আছি। একটা গরু আছে। এক পাশে গরু, অন্য পাশে আমরা থাকছি। স্ত্রী দুইবার স্ট্রোক করে খুবই অসুস্থ। আয়রোজগার তেমন নেই। ফসলও এই জলে মার গেছে। টাকা পয়সা নেই, চিকিৎসা করাবো কি করে। তিন বারের খাওন একবেলা খাচ্ছি। এ ভাবে কি আর বাঁচা যায়। আমাগের এই দুক্কোডা কি আর দূর হবে না? প্রশ্ন তোলেন তিনি। যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলার নিম্নাঞ্চলের অংশবিশেষ নিয়ে এই ভবদহ অঞ্চল। অভয়নগরের ভবানীপুর গ্রামে শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইচগেট দিয়ে ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হয়। পলি পড়ে এলাকার পানিনিষ্কাশনের মাধ্যম মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। এ অবস্থায় বৃষ্টির পানিতে এলাকার বিলগুলো উপচে গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, বর্ষা মৌসুম শেষ হয়েছে দেড় মাস আগে। কিন্তু সেই বর্ষার পানি নিষ্কাশন হতে না পারায় শরতের শেষ সময়ে এসেও যশোরের দুঃখখ্যাত ভবদহ অঞ্চলের অন্তত ১০০ গ্রাম জলাবদ্ধ রয়েছে। বর্ষকাল থেকে শুরু করে চার মাস ধরে এসব গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী জীবনযাপন করছে। বাড়ি থেকে রাস্তায় যাওয়া আসা করতে হচ্ছে সাঁকো অথবা ডিঙ্গি নৌকায় করে। দীর্ঘদিন ধরে চরম ভোগান্তির শিকার হয়ে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। ঘরবাড়ির পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও জলাবদ্ধ থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, টানা কয়েক মাসের বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধ এলাকা হচ্ছে অভয়নগরের বলারাবাদ, বেদভিটা, ডুমুরতলা, আন্ধা, দিঘলিয়া, বারান্দী, কোটা, ডহর মশিয়াহাটী, রাজাপুর, সুন্দলী, ভাটবিলা, সড়াডাঙা, হরিশপুর, ফুলেরগাতী এবং মনিরামপুরের হাটগাছা, সুজাতপুর, কুলটিয়া, লখাইডাঙ্গা, মহিষদিয়া, আলীপুর, পোড়াডাঙা, পদ্মনাথপুর, পাড়িয়ালী, দহাকুলা, কুচলিয়া, নেবুগাতী, পাঁচকাটিয়া, ভুলবাড়িয়া, কুমারসীমা, কপালিয়া, পাচাকড়ি। এসব গ্রামের কিছু পরিবার গরু-বাছুর ও হাঁস-মুরগি নিয়ে উঁচু সড়কের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ আবার বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। শনিবার সরেজমিনে আলাপকালে বেদভিটা, ডুমুরতলার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বর্তমানে পানি কিছুটা কমেছে। এক দিন বৃষ্টি হলে পানি বেড়ে যাচ্ছে। পানি থাকায় ঘরের মধ্যে মাচা করে সেখানে তারা থাকছেন। ডুমুরতলা গ্রামের নিরাপদ বিশ্বাস বলেন, গ্রামের দেড় শ বাড়ির সব বাড়িতে কমবেশি পানি। তার বাড়ির উঠানে পানি ছিল। অনেকটা নেমে গেছে। নিরাপদ বিশ্বাসের বাড়ির জলাবদ্ধতার ছবি উঠাতে গেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে বলতে শুরু করছিলেন- এসব ছবি উঠায়ে কি হবে। কয়েক দিন পর পর আপনারা (সাংবাদিক) আসেন আর ছবি তুলে যান; আমাগের তো কোন কাজ হলো না।’ # সমস্যা সমাধানে চলমান প্রকল্প ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে গত চার দশকে নেওয়া হয়েছে ২১টিরও বেশি প্রকল্প। খাল খনন, নদী সংস্কার, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজে ব্যয় হয়েছে হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘ চার দশক ধরে এই দুর্ভোগ অব্যাহত থাকলেও হয়নি স্থায়ী সমাধান। সবশেষ ২০২৪ সালে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ কিলোমিটার নদী সংস্কারকাজ কাজ চলমান রয়েছে। যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের (২য় পর্যায়) আওতায় সেনাবাহিনী ছয়টি নদী পুনঃখননের কাজ করছে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৯ কোটি ৯৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় অভয়নগরের ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইচগেট থেকে ডুমুরিয়ার কাশিমপুর পর্যন্ত হরি নদীর ১৫ কিলোমিটার, উপজেলার কাশিমপুর থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত তেলিগাতী নদী ৫ কিলোমিটার, মনিরামপুরের বাকোশপোল থেকে কেশবপুরের বরেঙ্গা পর্যন্ত হরিহর নদ ৩৫ কিলোমিটার, কেশবপুরের বরেঙ্গা থেকে কাশিমপুর পর্যন্ত আপার ভদ্রা নদী ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, অভয়নগরের গোঘাটা থেকে ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইচগেট পর্যন্ত টেকা নদী ৭ কিলোমিটার এবং মনিরামপুরের লেহালপুর বাজার এলাকায় ১ কিলোমিটার শ্রী নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৫৯ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে হরিহর নদের ৩৫ কিলোমিটার, আপার ভদ্রা নদীর ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এবং হরি নদীর ৬ দশমিক ২৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর সঙ্গে যুক্ত ২৪টি খালের ৭৮ দশমিক ২৩০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হচ্ছে। আগামী বছরের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। পাউবোর যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, ছয়টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ চলমান। এবার ভবদহ বিলের পানি বেড়ে ছিল তিন ফুটের মতো। ২১-ভেন্ট ভবদহ স্লুইচগেটের সব কটি কপাট খোলা রয়েছে। কপাট দিয়ে পানি বের হচ্ছে। খুব দ্রুত এই পানি নেমে যাবে। যদিও টিআরএম চালু না হওয়ায় এসব প্রকল্পের টাকা অপচয় হওয়ার আশঙ্কা করছেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি। সংগঠনটির আহ্বায়ক গাজী আবদুল হামিদ বলেন, ‘সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ কিলোমিটার নদী সংস্কারকাজ চলমান থাকলেও টিআরএম চালু না হওয়ায় সে টাকা অপচয় হবে।নদী খননের পর পলি জমে তা দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)-এর প্রস্তাবনা অনুযায়ী মাঘী পূর্ণিমার আগেই (আগামী চার মাসের মধ্যে) একটি বিলে টিআরএম চালু না করা গেলে এবং আমডাঙ্গা খাল দ্রুত প্রশস্ত ও খনন না করা হলে এই জনপদের দুর্ভোগ কাটবে না। #৫ অক্টোবর ভবদহ দিবস বছরের পর চলা এই দুর্ভোগ লাঘবে ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর যশোরের নওয়াপাড়াতে অবস্থান কর্মসূচি ও আন্দোলন করে ভবদহ পাড়ের হাজার হাজার মানুষ। সেদিন আন্দোলনকারীদের ওপর তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন অতর্কিত হামলা চালায়। এতে ভবদহ সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রনজিৎ বাওয়ালীসহ আহত হন শতাধিক মানুষ। ঐ ঘটনায় কেউ আহত হয়ে কেউ চোখ হারায় কেউ বা পা। ঐ দিনের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে দিন কাটাচ্ছে। হামলার আহত ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘জলাবদ্ধতার দুঃখ লাঘবে বছরের পর বছর সংগ্রাম করে যাচ্ছে ভবদহ পাড়ের মানুষ। তেমনি একটি দিন ছিলো ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর। সেদিন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পুলিশ হামলা চালায়। সেই ঘটনায় দুচোখেই আঘাত পান রনজিৎ বাওয়ালী। পরবর্তীতে তার দুই চোখই নষ্ট হয়ে যায়। দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও সে ভবদহ মানুষের জন্য লড়াই করতে করতে গত মাসে মারা যান। এভাবে আরোও অনেকেই আহতের দুঃসহীন স্মৃতি নিয়ে জীবন পার করছে। দুঃখের বিষয় হলো, সেই হামলার এখনো বিচার হয়নি। ২০১৬ সালের ঘটনার পর থেকে থেকে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর ভবদহ দিবস পালন করছে জলমগ্ন মানুষেরা। এদিন পদযাত্রা ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে ভবদহ সংগ্রাম কমিটি। সোমবার বিকাল চারটায় নওয়াপাড়া থেকে পদযাত্রা করে ভবদহ পাড়ের ২১ ভেল্টের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করবেন নেতৃবৃন্দ।

Ad for sale 100 x 870 Position (2)
Position (2)
Ad for sale 225 x 270 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 225 x 270 Position (4)
Position (4)