শেখ কাজিম উদ্দিন, বেনাপোল: বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেডে পণ্য আনলোডের সময় কাস্টমসের আইআরএম শাখার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) আরমানকে লাথি মারার অভিযোগ উঠেছে একই দপ্তরের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়ার বিরুদ্ধে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে লোকসম্মুখে ওই কর্মকর্তাকে লাথি মারা হয় বলে অভিযোগ। এ ঘটনার প্রতিবাদে কাস্টমসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পণ্য খালাসের কার্যক্রম বন্ধ করে দিলে প্রায় চার ঘণ্টা বন্দর থেকে পণ্য ছাড়করণ ব্যাহত হয়। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেডে পণ্য আনলোডের সময় এ ঘটনা ঘটে। কাস্টমস সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৪১ নম্বর শেডে আমদানি করা পণ্য আনলোডের কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আইআরএম শাখার এআরও আরমানকে। পণ্য আনলোডের সময় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়া। একপর্যায়ে শেডের ভেতরে লোকজনের উপস্থিতিতে রাগের বশবর্তী হয়ে যুগ্ম কমিশনার ওই এআরওকে একটি লাথি মারেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় সেখানে থাকা কাস্টমসের সহকর্মীরা এগিয়ে এসে বাধা দিলে পরিস্থিতি আর বড় আকার ধারণ করেনি। ঘটনার খবর দ্রুত কাস্টমস হাউসে ছড়িয়ে পড়লে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। প্রতিবাদে তাঁরা পণ্য খালাস ও ছাড়করণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। এতে প্রায় চার ঘণ্টা বেনাপোল কাস্টমস হাউসে আমদানি পণ্য ছাড়করণ কার্যক্রম বন্ধ থাকে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে ফিরে গেলে পণ্য খালাস কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়। ঘটনাটি শুক্রবার দিনভর কাস্টমসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বন্দরসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। পরে বিষয়টি লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন পেজে ঘটনাটি নিয়ে পোস্ট ও আলোচনা শুরু হয়। এতে একজন কাস্টমস কর্মকর্তাকে কর্মস্থলে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তবে ঘটনাটি নিয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টরা ৪১ নম্বর শেডের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন। এদিকে ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাংবাদিকরা সরাসরি কাস্টমস হাউসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় সাংবাদিকরা তাঁর কাছে এআরও আরমানকে লাথি মারার অভিযোগ, ৪১ নম্বর শেডের ঘটনা এবং পরবর্তীতে চার ঘণ্টা পণ্য খালাস বন্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চান। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়া বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি পরে কথা বলব।’ এরপর তিনি আর বিস্তারিত বক্তব্য না দিয়ে গাড়িতে করে কাস্টমস হাউস ত্যাগ করেন। এদিকে যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়ার আচরণ নিয়েও বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েকজন সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, কাস্টমসের বিভিন্ন কার্যক্রমে জটিলতা ও অসহযোগিতার কারণে তাঁদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ভোগান্তি বাড়ছে। তবে শুক্রবার বন্ধের দিন হওয়ায় এসব অভিযোগের সম্পূর্ণ তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলেন, বেনাপোল স্থলবন্দর দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর। এখানে কাস্টমসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাপ্তরিক কোনো সিদ্ধান্ত বা দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা বিধি অনুযায়ী তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন এআরও দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন কি না এবং তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটেছে কি না, দুটিই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ৪১ নম্বর শেডে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ঘটনার সময়কার ফুটেজ পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। তাঁরা বলেন, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কর্মস্থলে কোনো কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ সত্য হলে সেটিও প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাই উভয় পক্ষের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।