ম. ম. রবি ডাকুয়া, মোংলা : ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’-কালজয়ী এই গানের স্রষ্টা কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ৭০তম জন্মবার্ষিকী শুক্রবার (১৬ অক্টোবর)। তারুণ্য, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও প্রতিবাদী চেতনার এই কবিকে স্মরণ করতে তাঁর জন্মস্থান বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার মিঠেখালিতে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করে রুদ্র স্মৃতি সংসদ। সকালে কবির গ্রামের বাড়ি মিঠেখালিতে শোভাযাত্রা বের করা হয়। পরে তাঁর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও স্মরণানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে মিঠেখালি ফুটবল মাঠে বাগেরহাট সোনালী অতীত ও মোংলা সোনালী অতীতের মধ্যে প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যায় রুদ্র স্মৃতি সংসদ কার্যালয়ে কবির রচিত গান পরিবেশন করে তাঁর গড়া সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘অন্তর বাজাও’। ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর মোংলার মিঠেখালিতে জন্মগ্রহণ করেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। অল্প বয়সেই বাংলা কবিতায় নিজস্ব কাব্যভাষা ও স্বতন্ত্র ভাবনার পরিচয় দেন তিনি। মাত্র ৩৫ বছরের জীবনে কবিতা, গান ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন প্রতিবাদী তারুণ্যের অন্যতম প্রতীক। ১৯৯১ সালের ২১ জুন তাঁর অকালমৃত্যু হলেও সৃষ্টিশীলতার শক্তিতে তিনি আজও বেঁচে আছেন পাঠক ও শ্রোতার হৃদয়ে। রুদ্রর কবিতায় বারবার উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাম্যবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন’—তাঁর এই উচ্চারণ অন্যায় ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে আছে। আবার ‘দিন আসবেই দিন সমতার’ পঙ্?ক্তিতে ফুটে উঠেছে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন। তাঁর কবিতার শক্তি কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নয়। প্রেম, বিরহ, স্বপ্ন, সৌন্দর্য ও মানুষের অন্তর্গত অনুভূতিও তাঁর লেখায় পেয়েছে গভীর প্রকাশ। জীবন ও সমাজকে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি, স্পষ্ট উচ্চারণ এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার মানসিকতা তাঁকে বাংলা কবিতায় আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। স্বল্পায়ু জীবনে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সাতটি কাব্যগ্রন্থসহ গল্প, কাব্যনাট্য এবং অর্ধশতাধিক গান রচনা ও সুরারোপ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘উপদ্রুত উপকূল’ ও ‘ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কবিতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি যে প্রতিবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মীদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। কবির লেখা ও সুর করা ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ গানটি দুই বাংলার শ্রোতাদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। গানটির জন্য তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির ১৯৯৭ সালের শ্রেষ্ঠ গীতিকারের সম্মাননা মরণোত্তর লাভ করেন। বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৪ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। জন্মভূমি মোংলার মিঠেখালিতে প্রতিবছর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে কবিকে স্মরণ করেন তাঁর অনুরাগী, স্বজন ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। এবারের আয়োজনেও কবির সাহিত্যকর্ম, গান এবং সাম্য ও মানবমুক্তির আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সময় পেরিয়ে গেলেও রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা ও গান মানুষের অধিকার, সাম্য এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে তাই কবিকে স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁর জীবনদর্শন ও প্রতিবাদী চেতনাকে ধারণ করার আহ্বানও জানাচ্ছেন তাঁর অনুরাগীরা।