বিল্লাল হোসেন : ভূমিহীন শহিদুল ইসলাম। পরিবারে স্বচ্ছলতা আনতে বড় ছেলে আরিফকে (৩০) পাঠিয়েছিলেন বিদেশ (মালয়েশিয়া)। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তিনি বাবা-মা’র মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন। মাথা গোঁজার জন্য কিনেছেন ৫ শতক জমি। ১১ বছর ১৭ দিন পর সোমবার (১ জুন) দিবাগত রাতে দেশে ফেরেন তিনি। তাকে বরণ করতে ঢাকা বিমানবন্দরে যান আরিফের মা নুরজাহান বেগম (৫০), বোন আয়শা খাতুন (২৮), ভাই রাকিবুল ইসলাম (১৮), ভাগ্নে আশরাফুল হোসেন (৭) ও ভাগ্নি তাছফিয়া খাতুন (৩)। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথেই মা, ভাই-বোনসহ লাশ হলেন আরিফ। মঙ্গলবার (২ জুন) ভোর ৪ টার দিকে ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মালিগ্রাম ফ্লাইওভার পার হওয়ার আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। প্রবাসী আরিফ যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের ইজিবাইক চালক শহিদুল ইসলামের ছেলে। বাড়ি ফিরে আরিফের বিয়ের জন্য বুধবার পাত্রী দেখতে যাওয়ার কথা ছিলো পরিবারের সদস্যদের। আনন্দ উৎসবের পরিবর্তে শহিদুলের বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে।
নিহতদের প্রতিবেশী ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মোসলেম আলী বলেন, শহিদুল ইসলামের আগে চায়ের দোকান ছিলো। বর্তমানে তিনি ইজিবাইকের চালক। সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে ১১ বছর আগে বড় ছেলে আরিফকে মালয়েশিয়া পাঠিয়েছিলেন। বিদেশ থেকে প্রথমবার বাড়ির ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। একই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তার মা, ভাই- বোন ও প্রাইভেটকার চালক জাহিদ হোসেন (৩৫)। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস শহিদুল ইসলামের পরিবারে আর কেউ থাকলেন না। স্ত্রী সন্তানদের হারিয়ে শোকে নির্বাক হয়ে পড়েছেন শহিদুল।
বাঁকড়া গ্রামের শাহিন রহমান জানান, মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা শহিদুলের পরিবারের ৪ সদস্যের জীবন কেড়ে নিয়েছে। দীর্ঘ ১১ বছর পর আরিফের বাড়ি ফেরার আনন্দ মুহূর্তেই বিভীষিকাময় বিষাদে পরিনত হলো। শহিদুলকে সান্তনা দেওয়ার ভাষা জানা নেই। পুরো একটি পরিবারের এমন মর্মান্তিক সমাপ্তিতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহত আরিফের মামা আবদুল কাদের বলেন, ১৮ বছর বয়সে বিদেশ গিয়েছিল আরিফুল ইসলাম। অভাবের সংসার ছিলো। এখন তাদের সুখের সংসার। যখন সুখ ভোগ করবে তখন পরিবারের চারজন চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার বাড়ি ফিরে বুধবার আরিফের বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তার আর বিয়ের পিড়িতে বসা হলো না।
মামাতো ভাই মিন্টু রহমান বলেন, পরিবার খুবই দরিদ্র ছিল। ভূমিহীন ছিল। সংসারের সুখ ফেরাতে বিদেশ গিয়েছিলেন। জমি কিনে জমি বাড়ি নির্মাণ করেছে। সংসারে সুখ ফিরেছে। কিন্তু সেই সুখ আর হলো না। বাড়িতে শোকের মাতম চলছে।
ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম কিবরিয়া হাসান জানান, ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনায় মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৪ জনের বাড়ি ঝিকরগাছা ও আরেকজনের বাড়ি মণিরামপুরে। সার্বিক সহযোগিতার জন্য শহিদুল ইসলামের বাড়িতে পুলিশের একটি টিম পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ঢাকা থেকে যশোরগামী প্রাইভেটকারটি মঙ্গলবার (২ জুন) ভোর ৪ টার দিকে ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মালিগ্রাম ফ্লাইওভার পার হওয়ার আগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে প্রাইভেটকার দুমড়ে মুচড়ে ৫ জন মারা যান।