আবদুল কাদের : যশোর জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে এক হাজার ২৯০টি। এর মধ্যে শতভাগ বিদ্যালয়ের টিউবওয়েলে আর্সেনিক পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ১৬টি বিদ্যালয়ে পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক। বাকি বিদ্যালয়ের টিউবওয়েলে সহনীয় মাত্রা শূন্য দশমিক ৫-৬ মিলিগ্রাম আর্সেনিক রয়েছে। সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ল্যাবে পানি পরীক্ষা করে এই চিত্র মিলেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে এক হাজার ২৯০টি। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদ্যালয় রয়েছে মণিরামপুর উপজেলায় ২৬৭টি। এছাড়া সদর উপজেলায় রয়েছে ২৫১টি, অভয়নগরে ১১৭টি, বাঘারপাড়ায় ১০২টি, চৌগাছায় ১৩৯টি, ঝিকরগাছায় ১৩১টি, কেশবপুরে ১৫৮টি ও শার্শা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১২৫টি। এসব বিদ্যালয়ে অবস্থিত টিউবয়েলের পানি পরীক্ষা করে তাতে সবকটি টিউবওয়েলে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যারমধ্যে ১৬টি বিদ্যালয়ে পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর টিউবওয়েলে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষরা বিষয়টি অবগত নয়। যেকারণে এসব টিউবওয়েলে পানি পান করছেন কমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। এতে করে চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তারা। মাত্রাতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৬২ মিলিগ্রাম আর্সেনিক মিলেছে মণিরামপুরের কাশিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আবদুস সাত্তার জানান, আমাদেরকে কেউ অবহিত করেনি যে, স্কুলের কলে (টিউবওয়েলে) মাত্রাতিরিক্ত শুন্য দশমিক ৬২ মিলিগ্রাম আর্সেনিক মিলেছে। তাহলে আমরা কলে লাল রঙ করে দিতাম। তারপরও বিষয়টি নিয়ে আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেব। কেননা আর্সেনিকযুক্ত পানিতো শিশুদের পান করতে দেয়া যায়না। জেনেশুনে আমরা তাদেরকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারিনা। একই উপজেলার শ্যামকুড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিউবওয়েলে মিলেছে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শূন্য দশমিক ১০২ মিলিগ্রাম। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র জানান, আমাদের টিউবওয়েলে সবুজ রঙ করা রয়েছে। কেউতো এসে বলেনি মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। তাহলেতো আমরা শিশু শিক্ষার্থীদেরকে সতর্ক করব যেন তারা ওই কলের পানি পান না করে। তবে আমাদের বিদ্যালয়ে ডিপ টিউবওয়েল রয়েছে। সেই পানি শিক্ষার্থীরা পান করে। শার্শা উপজেলার কায়বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিউবওয়েলে পাওয়া গেছে, শূন্য দশমিক ৬৫ মিলিগ্রাম আর্সেনিক। যা ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মোছা, সাইদুন্নেছা জানান, আমাদের স্কুলে ১৮৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। আমাদের বিদ্যালয়ে দুটি কল রয়েছে। একটি কল বাইরে অবস্থিত। সেটির পানি কেউ খায়না। ভেতরে অবস্থিত কলের পানি শিক্ষার্থী ও অন্যান্যরা পান করে। তারপরও বাইরে কলে যদি মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া যায় সেটি আমাদেরকে অবহিত করা প্রয়োজন ছিল। কেননা কেউ যদি ওই কলের পানি পান করে তাহলে তার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি কবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অফিসে যোগাযোগ করব। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আলিম গাজী জানান, সম্প্রতি আমরা যশোর জেলার ৮টি উপজেলার এক হাজার ২৯০টি টিউবওয়েলের পানির আর্সেনিক পরীক্ষা কার হয়েছে আমাদের নিজস্ব ল্যাবে। সেখানে সবকটি টিউবয়েলের পানিতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা হলো ১৬টি। বাকি বিদ্যালয়ের টিউবওয়েলে সহনীয় মাত্রা শূন্য দশমিক ৫-৬ মিলিগ্রাম আর্সেনিক রয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ সংস্থা ডব্লিউএচও মতে টিউবওয়েলে ১০ মিলিগ্রাম আর্সেনিক থাকলে সেই পানি পান করা যাবেনা। যশোর মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার মাহাবুবুর রহমান জানান, আর্সেনিক হলো বিষ, ন্যূনতম আর্সেনিক থাকলেও সেই পানি পান করা যাবেনা। সেখানে ৫ মিলিগ্রাম আর্সেনিকও শিশুদের জন্য ঝুঁকি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোকে উদ্যোগী হতে হবে। কেননা নিরাপদ পানি না পান করলে শিশুদের নানা ধরণের রোগ-ব্যাধি পেয়ে বসবে। সচেতন নাগরিক কমিটি যশোরের সভাপতি অধ্যাপক পাভেল চৌধুরী জানান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে এটা খুবই উদ্বেগের। বিষয়টি দ্রুত সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলোকে অবহিত করা দরকার। না জানানো আমি মনে করি অপরাধ। না জানার কারণে স্কুলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পানি পান করছে। এতে করে তারা চরমভাবে স্বাস্থঝুঁকিতে রয়েছে। এব্যাপারে যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) খান মাসুম বিল্লাহ জানান, যেসব টিউবওয়েলে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক সনাক্ত হয়েছে সেই টিউবওয়েলের পানি পান করা যাবেনা। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করব।